শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬, ১৮ মাঘ ১৪৩২


ছড়িয়ে পড়া স্তন ক্যানসার চিকিৎসায় ‘গেম-চেঞ্জার’ হতে পারে নতুন এক পরীক্ষা

স্বাস্থ্য ডেস্ক

প্রকাশিত:৩১ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:২৯

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে সারা বিশ্বে প্রায় ২৩ লাখ নারী স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন।

বর্তমানে স্তন ক্যানসারের বেশ কিছু চিকিৎসা পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন, ইমিউনোথেরাপি এবং নির্দিষ্ট ধরনের স্তন ক্যানসারের জন্য টার্গেটেড থেরাপি অন্যতম।

তবে সব ধরনের থেরাপি প্রতিটি রোগীর ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর হয় না। চিকিৎসার সফলতা মূলত ক্যানসারের ধরন, পর্যায় এবং রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের মতো নানা বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এ কারণে কোন রোগীর ক্ষেত্রে কোন চিকিৎসা কতটা কার্যকর হবে, তা চিকিৎসকদের পক্ষে আগে থেকে অনুমান করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।

সম্প্রতি ‘ক্লিনিক্যাল ক্যানসার রিসার্চ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় নতুন এক ধরনের ‘লিকুইড বায়োপসি’র তথ্য সামনে আনা হয়েছে। এই পদ্ধতিটি অ্যাডভান্সড পর্যায়ের স্তন ক্যানসার রোগীদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো ‘টার্গেটেড থেরাপি’ কতটা কার্যকর হবে, তা আগেভাগে বুঝতে সাহায্য করবে।

রক্ত পরীক্ষায় মিলবে ‘সার্কুলেটিং টিউমার ডিএনএ’

গবেষণার অংশ হিসেবে বিজ্ঞানীরা ‘প্লাজমাম্যাচ’ ট্রায়ালে অংশ নেওয়া ১৭৬ জন অ্যাডভান্সড স্তন ক্যানসার রোগীর রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করেন। গবেষকরা মূলত রক্তে ‘সার্কুলেটিং টিউমার ডিএনএ’ (ctDNA) শনাক্ত করার চেষ্টা করেন। এটি হলো ক্যানসার কোষ বা টিউমার থেকে নিঃসরিত ডিএনএ-র অতি ক্ষুদ্র অংশ, যা রক্তপ্রবাহে ভেসে বেড়ায়।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের স্তন ক্যানসারের ধরন এবং জেনেটিক পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে দুটি দলে ভাগ করা হয়। প্রথম দলে ছিলেন এমন রোগীরা, যাদের ক্যানসার কোষে ESR1, HER2, AKT1, AKT অথবা PTEN-এর মতো জিনগত পরিবর্তন রয়েছে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় দলে রাখা হয় ‘ট্রিপল নেগেটিভ’ স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের, যাদের শরীরে লক্ষ্যযোগ্য কোনো জিনগত পরিবর্তন নেই।

বিজ্ঞানীরা স্তন ক্যানসারের চিকিৎসা শুরু করার আগে এবং চিকিৎসা শুরুর চার সপ্তাহ পর—উভয় সময়েই রক্তে সিটিডিএনএ’র পরিমাণ পরিমাপ করেন।

সিটিডিএনএ: একটি কাটাছেঁড়াহীন বায়োমার্কার

গবেষণার প্রথম দলটিতে দেখা গেছে, চিকিৎসা শুরুর চার সপ্তাহ পর যাদের রক্তে সিটিডিএনএ শনাক্ত করা যায়নি, তাদের ক্ষেত্রে ফলাফল বেশ আশাব্যঞ্জক। তাদের ক্যানসার প্রায় ১০ দশমিক ৬ মাস পর্যন্ত সুপ্ত বা স্থিতিশীল অবস্থায় ছিল। অন্যদিকে, যাদের রক্তে সিটিডিএনএ শনাক্ত হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই সময়কাল ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৫ মাস।

একই দলের অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে দেখা গেছে, চার সপ্তাহের চিকিৎসা শেষে যাদের রক্তে সিটিডিএনএ’র মাত্রা কম ছিল, তাদের ৪৬.২ শতাংশই চিকিৎসায় ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। বিপরীতে, যাদের রক্তে সিটিডিএনএ’র মাত্রা বেশি ছিল, তাদের ক্ষেত্রে এই সাফল্যের হার ছিল মাত্র ৭.৯ শতাংশ।

দ্বিতীয় দলটির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, চিকিৎসা শুরুর আগেই যাদের রক্তে সিটিডিএনএ-র মাত্রা কম ছিল, তাদের ক্যানসার প্রায় ১০.২ মাস পর্যন্ত আর বাড়েনি (প্রোগ্রেসন-ফ্রি সারভাইভাল)। তবে যাদের রক্তে এই ডিএনএ-র পরিমাণ বেশি ছিল, তাদের ক্ষেত্রে এই সময়কাল ছিল মাত্র ৪.৪ মাস।

এই দলেও যাদের রক্তে সিটিডিএনএ’র মাত্রা কম ছিল, তাদের ৪০ শতাংশই চিকিৎসায় ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। অন্যদিকে, উচ্চ মাত্রার সিটিডিএনএ থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল মাত্র ৯.৭ শতাংশ।

এ ছাড়া দ্বিতীয় দলের রোগীদের ক্ষেত্রেও রক্তে সিটিডিএনএ’র মাত্রার সঙ্গে চিকিৎসার ফলাফলের একটি যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা।

উদাহরণস্বরূপ, যাদের রক্তে সিটিডিএনএ আর শনাক্ত করা যায়নি, তাদের ক্যানসার প্রায় ১২ মাস পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং ৮৫.৭ শতাংশ রোগীই চিকিৎসায় ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। এর বিপরীতে, যাদের রক্তে সিটিডিএনএ শনাক্ত হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই সময়কাল ছিল মাত্র ৪.৩ মাস এবং সাফল্যের হার ছিল ১১.৪ শতাংশ।

লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চের ক্লিনিক্যাল রিসার্চ ফেলো এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক ডা. আইসল্ট ব্রাউন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, “অ্যাডভান্সড স্তন ক্যানসার রোগীদের রক্তের নমুনা থেকে সিটিডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা একটি স্পষ্ট যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছি। চিকিৎসা শুরুর আগে এবং প্রথম ধাপের চিকিৎসা শেষে রক্তে এই ডিএনএ-র মাত্রা দেখে বোঝা সম্ভব রোগী থেরাপিতে কতটা সাড়া দেবেন।”

মেটাস্ট্যাটিক স্তন ক্যানসার রোগীদের জন্য আশার আলো

এই গবেষণার বিষয়ে ‘মেডিকেল নিউজ টুডে’ কথা বলেছে ক্যালিফোর্নিয়ার ফাউন্টেন ভ্যালিতে অবস্থিত মেমোরিয়ালকেয়ার ব্রেস্ট সেন্টারের ব্রেস্ট ইমেজিং বিভাগের মেডিকেল ডিরেক্টর এবং রেডিওলজিস্ট ডা. রিচার্ড রেইথারম্যানের সঙ্গে।

এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও ডা. রেইথারম্যান জানান, গবেষণায় এমন একদল স্তন ক্যানসার রোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাদের ক্যানসার স্তন এবং বগলের বাইরে শরীরের অন্যান্য অঙ্গেও ছড়িয়ে পড়েছে। একে চতুর্থ পর্যায় বা ‘মেটাস্ট্যাটিক’ পর্যায় বলা হয়।

তিনি আরও বলেন, “ক্যানসার যখন শরীরের অন্যান্য অঙ্গে— সাধারণত হাড়, লিভার এবং ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা শনাক্ত করা এবং চিকিৎসা করা অনেক বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।”

ডা. রেইথারম্যান বলেন, “এই গবেষণার গুরুত্ব কেবল মেটাস্ট্যাটিক রোগের দ্রুত শনাক্তকরণ কিংবা চিকিৎসার কার্যকারিতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং রক্তে সিটিডিএনএ’র মাত্রা দেখে আগেভাগেই বলে দেওয়া সম্ভব কোন রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসা কাজে আসবে আর কার ক্ষেত্রে আসবে না।”

তিনি আরও যোগ করেন, “মেটাস্ট্যাটিক ক্যানসারের চিকিৎসায় সাধারণত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক বিকল্প ওষুধ ব্যবহার করতে হয়। কারণ ক্যানসার কোষগুলো প্রায়ই নির্দিষ্ট কোনো ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে।”

তার মতে, “এই গবেষণাটি দেখিয়েছে যে কীভাবে লিকুইড বায়োপসির মাধ্যমে সিটিডিএনএ পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত বোঝা সম্ভব কোন রোগী চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছেন আর কে দিচ্ছেন না। এর ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা সহজ হবে।”

ডা. রেইথারম্যান মন্তব্য করেন, এই গবেষণাটি বিজ্ঞানের সেই বিস্ময়কর অগ্রগতিকে তুলে ধরে যা কেবল মৌলিক গবেষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সরাসরি প্রয়োগযোগ্য এবং বর্তমানে মেটাস্ট্যাটিক স্তন ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়ছেন এমন রোগীদের জন্য প্রকৃত সুফল বয়ে আনবে।

তিনি আরও বলেন, “স্তন ক্যানসার রোগীদের জন্য আশা খুবই জরুরি। তাদের এমন কিছুর ওপর বিশ্বাস রাখা প্রয়োজন যা কেবল বর্তমানের জন্য নয়, বরং তাদের ভবিষ্যতের জন্যও সহায়ক হবে।”

ফলাফলের সঙ্গে বেঁচে থাকার হারের সমন্বয় প্রয়োজন

এই গবেষণার বিষয়ে ‘মেডিকেল নিউজ টুডে’ (এমএনটি) হার্টফোর্ড হেলথকেয়ার ক্যানসার ইনস্টিটিউটের ব্রেস্ট অনকোলজি বিভাগের মেডিকেল ডিরেক্টর ডা. রিচার্ড জেলকোভিটসের সঙ্গেও কথা বলেছে। তিনি এই গবেষণার ফলাফলকে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ও রোমাঞ্চকর বলে অভিহিত করেছেন।

ডা. জেলকোভিটস ব্যাখ্যা করেন, “কোন রোগী নির্দিষ্ট চিকিৎসায় ঠিকমতো সাড়া দিচ্ছেন না তা শনাক্ত করা এবং যত দ্রুত সম্ভব রোগীর চিকিৎসা পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা মেটাস্ট্যাটিক স্তন ক্যানসার সেবার ক্ষেত্রে এক আমূল পরিবর্তন (গেম-চেইঞ্জার) নিয়ে আসবে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “হরমোন সেনসিটিভ অ্যাডভান্সড স্তন ক্যানসার রোগীদের সাধারণ চিকিৎসার অংশ হিসেবে আমরা ক্রমাগত ‘সার্কুলেটিং ডিএনএ’ পর্যবেক্ষণ করি। এটি আমাদের জটিল রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট ধরনের চিকিৎসা বেছে নিতে সাহায্য করে। এর ফলে আমরা রোগীদের আরও বেশি ব্যক্তিগত বা সুনির্দিষ্ট সেবা নিশ্চিত করতে পারি।”

ডা. জেলকোভিটস আরও বলেন, “স্তন ক্যানসারের অ্যাডভান্সড পর্যায়ের চিকিৎসার ক্ষেত্রে আগেভাগেই পূর্বাভাস পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

তিনি আমাদের বলেন, “একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসা পদ্ধতি কাজ করছে কি না তা জানতে পারা রোগীদের জন্য সম্ভাব্য সেরা চিকিৎসা পরিকল্পনা এবং ফলাফল নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি করতে পারে। যদি আপনি চিকিৎসার কার্যকারিতা বুঝতে পারেন, তবে থেরাপি কীভাবে চালিয়ে যেতে হবে তাও জানতে পারবেন।”

ডা. জেলকোভিটস আরও যোগ করেন, “আমাদের এই ফলাফলগুলোকে রোগীদের বেঁচে থাকার হারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। যদি আমরা প্রমাণ করতে পারি যে, দ্রুত শনাক্তকরণের ফলে রোগীর জীবনযাত্রার মান এবং চিকিৎসার ফলাফলে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, তবে সেটিই হবে আসল সাফল্য।”

সম্পর্কিত বিষয়:

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)
আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

নামাজের সময়সূচি

ওয়াক্ত সময়সূচি
ফজর ০৫:২২ ভোর
যোহর ১২:১২ দুপুর
আছর ০৪:০৭ বিকেল
মাগরিব ০৫:৪৬ সন্ধ্যা
এশা ০৭:০১ রাত

শনিবার ৩১ জানুয়ারী ২০২৬