মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সদ্য ক্ষমতা হারানো রাজনৈতিক দল তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় কংগ্রেস ও অন্যান্য বিজেপি বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে দিল্লিতে বৈঠক করছেন। সোমবার দিল্লিতে মমতা যখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন তখন সেখান থেকে অনতিদূরে তৃণমূলের আরও বহু সংসদ সদস্য বিদ্রোহী হয়ে বিজেপিকেই সমর্থন দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
সোমবার দিল্লিতে ‘ইনডিয়া’ জোটের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকে মমতা ছাড়াও সংসদ সদস্য ডেরেক ও’ব্রায়ান, অভিষেক বন্দোপাধ্যায় ও কল্যাণ বন্দোপাধ্যায় ছিলেন।
তবে ঠিক সেই সময়েই দিল্লিতেই বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভুপেন্দ্র ইয়াদভের সঙ্গে দেখা করলেন তৃণমূল কংগ্রেসের একগুচ্ছ বিদ্রোহী সংসদ সদস্য। ওই বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও উপস্থিত ছিলেন এবং তার আহ্বানেই এই বৈঠক বলে জানিয়েছেন বিদ্রোহী সংসদ সদস্য কাকলি ঘোষ দস্তিদার।
ওই বৈঠকের একটি ছবি সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, সেখানে উপস্থিত ছিলেন শর্মিলা সরকার, রাজ্যসভার সংসদ সদস্যপদ থেকে সদ্য ইস্তফা দেওয়া সুখেন্দুশেখর রায়।
এছাড়াও ওই ছবিতে জগদীশচন্দ্র বসুনিয়া, অরূপ চক্রবর্তী, অসিত মল, কালীপদ সোরেন-সহ আরও কয়েকজন তৃণমুল কংগ্রেসের বিদ্রোহী সংসদ সদস্যকেও দেখা যায়।
ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা পিটিআইকে বিদ্রোহী সংসদ সদস্য কাকলি ঘোষ দস্তিদার বলেছেন, ইতোমধ্যে লোকসভার ২০ জন বিদ্রোহী সংসদ সদস্য স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন তাদের সিদ্ধান্তের কথা। তবে সোমবারের বৈঠকে ওই ২০ জনের সকলেই হাজির ছিলেন, কি না; তা এখনো অস্পষ্ট।
• কী বললেন বিদ্রোহী সংসদ সদস্যরা
দিল্লিতে বিজেপি নেতৃত্বাধীন শাসক গোষ্ঠী এনডিএকে সমর্থন জানিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের এই বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের জোটটি। ওই বৈঠকে উপস্থিত সংসদ সদস্য শর্মিলা সরকার বলেছেন, একাধিক বিদ্রোহী সংসদ সদস্য কেন্দ্রে বিজেপির নেতৃত্বাধীন শাসক জোট এনডিএকে সমর্থন করবেন।
কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে এই নতুন ব্লক সংসদে শাসকগোষ্ঠীকে সমর্থন দেবে বলে জানিয়েছেন তিনি। কলকাতার সংবাদমাধ্যম এবিপি আনন্দকে কাকলি ঘোষ দস্তিদার জানিয়েছেন, আমি তৃণমূল কংগ্রেসে বহু পুরোনো সংগ্রামের মানুষ, সরকারে আসার আগে থেকেই আমরা তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য কাজ করছি তবে বর্তমানে মনে হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসে থেকে আর কাজ করা যাচ্ছে না।
কেন্দ্রীয় শাসকদল এনডিএকে আপাতত তিন বছর সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তৃণমূলের এই বিদ্রোহী সংসদ সদস্যরা। এই মুহূর্তে এই গোষ্ঠীর সদস্যরা কেউ বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন না বলেও জানিয়েছেন শর্মিলা সরকার ও কাকলি ঘোষ দস্তিদার।
কাকলি ঘোষ দস্তিদার বিদ্রোহের সুর সুনিয়েছিলেন আগেই। গত ২৭শে মে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের সব কমিটি থেকে ইস্তফা দেন। সংসদে কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে বিজেপির বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে শোনা গিয়েছে বার বার।
যদিও বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের হারের পরে সুর বদলেছিলেন তিনি। তৃণমূল সংসদ সদস্য কল্যাণ বন্দোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তাকে সম্প্রতি বিভিন্ন অভিযোগ করতে শোনা গিয়েছে। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের প্রতিও তিনি নিজের মতপার্থক্য ব্যক্ত করেছেন।
শর্মিলা সরকার বলেছেন, সাবেক শাসক দল তৃণমূলের যা যা দুর্নীতির খবর বেরিয়ে আসছে, তাতে আর সমর্থন করার ইচ্ছা হয় না, এমন নয় যে শাসকগোষ্ঠীর সব নীতির সঙ্গে আমাদের ঐকমত্য রয়েছে। তবে এই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নের জন্য বিজেপিকে সমর্থন দেওয়াই আমাদের উপযুক্ত মনে হয়েছে।
তবে রাজ্যে ঋতব্রত ব্যানার্জীর নেতৃত্বে যে আলাদা তৃণমূল ব্লক তৈরি হয়েছে, সংসদীয় বিদ্রোহী ব্লকটি এই রাজ্য ব্লকের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না সেই উত্তর দিতে চাননি শর্মিলা সরকার। যদিও আজই কলকাতায় ঋতব্রত ব্যানার্জীর সঙ্গে দেখা করেছেন কলকাতা পৌরসভার সাবেক মেয়র ফিরহাদ হাকিম, যিনি এক সময়ে মমতা-ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত ছিলেন।
তবে দিল্লির ঘটনা নিয়ে ঋতব্রত ব্যানার্জী বলেছেন, দিল্লিতে যে ব্লক গঠিত হয়েছে সেই বিষয়ে তিনি অবগত থাকলেও তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি অবগত নন। যদিও সংসদ সদস্যরা একসঙ্গে বসে কথা বলতে চান, সেটা কলকাতা থেকে দূরে দিল্লিতে হলেও তাতে আপত্তি থাকার কথা নয়।
তবে তৃণমূলের এই বিদ্রোহী ব্লক নিয়ে মমতা ঘনিষ্ঠ নেতা কুণাল ঘোষ বলেছেন, আপনি যখন নির্বাচন জিতেছেন, তখন মমতা ব্যানার্জীর মুখকে সামনে রেখেই জিতেছেন। তৃণমূল কংগ্রেস যদি সরকার গঠন করতে সমর্থ হতো, তবে এই আজকের বিরোধীরা কোনও বিদ্রোহ না করেই দলে থাকতেন।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি বিধায়ক ও মন্ত্রী তাপস রায় মন্তব্য করেছেন, দলের বর্ষীয়ান নেতাদের শুধু অভিষেক ব্যানার্জীর আদেশ মান্য করতে বলা দলের পুরোনো নেতারা ভালোভাবে নেননি।
• ইনডিয়া ব্লকের বৈঠকে কী হলো?
যে বিজেপি বিরোধী গোষ্ঠী ইনডিয়া জোটের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মমতা, সেই বৈঠকে আজ পাঁচটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে জানিয়েছেন, সেই পাঁচটি সিদ্ধান্ত হলো,
প্রথম, ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে চিঠি দেওয়া হবে।
দ্বিতীয়, বিরোধীরা সংসদে একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেবেন।
তৃতীয়, প্রতি দুই মাস অন্তর হবে ইন্ডিয়া ব্লকের মিটিং। পরবর্তী মিটিং ডাকা হয়েছে হায়দরাবাদে।
চতুর্থ, নিট এবং সিবিএসই পরীক্ষায় অনিয়মের দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি তোলা।
পঞ্চম, জনগণের সমস্যাগুলি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে একটি সর্বদলীয় বৈঠক ডাকার আহ্বান।
অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরালার মতো একাধিক রাজ্যে ইন্ডিয়া জোটের সদস্য দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সংসদে তারা একই সুরে বিজেপির বিরোধিতার কথা বলেছেন। যদিও ইনডিয়া জোটের সবচেয়ে বড় শরীকদের মধ্যে একটি দল তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক সংসদ সদস্য বিদ্রোহী হয়ে শাসককে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় এই জোট কতটা শক্তিশালী থাকল, এই প্রশ্ন তুলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিবিসি বাংলা।