সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১৩ মাঘ ১৪৩২


বিদেশি মিশনে ই-পাসপোর্ট সেবা

নানা আপত্তি, তবু বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে চায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:২৬ জানুয়ারী ২০২৬, ২০:১৫

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট আপত্তি ও বিদ্যমান নীতিমালা উপেক্ষা করে দুবাইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনে ই-পাসপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ কনস্যুলার সেবা একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিতে যাচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে রাষ্ট্র ও নাগরিকদের সংবেদনশীল তথ্য বিদেশিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যা নিয়ে প্রশাসনের অভ্যন্তরে এবং বিশেষজ্ঞ মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বিদ্যমান নীতিমালায় বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণের সুযোগ নেই। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়েরও স্পষ্ট আপত্তি রয়েছে। তবু নীতিমালা উপেক্ষা করে দুবাইয়ে বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠানকে ই-পাসপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ কনস্যুলার সেবা দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের ভেতরেও ব্যাপক আপত্তি রয়েছে। তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের সংবেদনশীল তথ্যভাণ্ডারে বাইরের একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রবেশাধিকার দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। প্রতিষ্ঠানটিকে দায়িত্ব দিতে একটি খসড়া চিঠিও তৈরি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) প্রদানে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে দুবাইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের সঙ্গে চুক্তি হয় মালয়েশিয়ার কোম্পানি ‘ফশওয়া এসডিএন বিএইচডি’র স্থানীয় অপারেটর ‘ফশওয়া গ্লোবাল ডকুমেন্টস কপিইং সার্ভিস কোম্পানি এলএলসি, দুবাই’-এর সঙ্গে। ওই চুক্তি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি শুধু মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) সেবায় সহযোগিতা করার কথা ছিল। তবে সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি বিবেচ্যপত্র পাঠানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। যেখানে সংশ্লিষ্ট ওই প্রতিষ্ঠানকে এমআরপি (মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট) সেবায় সহযোগিতার পাশাপাশি ই-পাসপোর্ট প্রক্রিয়াকরণসহ অন্যান্য কনস্যুলার সেবা কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়।

সেই অনুযায়ী বিদেশি ওই প্রতিষ্ঠানকে বিদ্যমান চুক্তির বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত কাজের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ডিজিটাল ডেটা ট্রান্সফার প্রক্রিয়াসহ নানা সরঞ্জাম ও অবকাঠামো তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি ছাড়া নির্ধারিত চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত কাজ দেওয়ার বিষয়টি গুরুতর উদ্বেগের কারণ বলে মনে করছেন তারা।

বিদেশি মিশনে আউটসোর্সিং সেবা ক্রয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘না’

নথিপত্রে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে বিদেশস্থ বাংলাদেশ মিশনে পাসপোর্ট সেবা দিতে আউটসোর্সিং এজেন্ট বা প্রতিষ্ঠান নিয়োগ কিংবা মিশনে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় কাজ দেওয়া যাবে কি না- সে বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়।

একই বছরের ২৭ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর একটি মতামত পাঠানো হয়। উপসচিব কাজী লুতফুল হাসান স্বাক্ষরিত ওই স্মারকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, ‘বৈদেশিক মিশনে আউটসোর্সিং সেবা ক্রয়ের সুযোগ নেই’।

স্মারকে বলা হয়, অর্থ বিভাগের জারিকৃত আউটসোর্সিং নীতিমালা–২০২৫ কার্যকর থাকা অবস্থায় বৈদেশিক মিশনে আউটসোর্সিং সেবা গ্রহণের সুযোগ নেই। তা ছাড়া বিদেশস্থ বাংলাদেশ মিশনগুলোতে রাজস্ব খাতে এবং স্থানীয় ভিত্তিতে জনবল থাকায় বিদ্যমান জনবল দিয়েই প্রস্তাবিত পাসপোর্ট সেবা দেওয়া সম্ভব। এ কারণে পৃথক কোনো নীতিমালা জারির প্রয়োজন নেই।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই স্পষ্ট নির্দেশনা উপেক্ষা করেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার সব প্রক্রিয়া শেষ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘না’, তবু বারবার অনুরোধ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের

অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একের পর এক চিঠি পাঠিয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত কাজ দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবরের নির্দেশনার পরও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (কনস্যুলার) তানভীর আহমেদ স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে ‘ফশওয়া গ্লোবাল ডকুমেন্টস কপিইং সার্ভিস কোম্পানি এলএলসি’কে ই-পাসপোর্ট প্রক্রিয়াকরণসহ অন্যান্য সব কনস্যুলার সেবা পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুরোধ জানানো হয়।

এই আবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর পাঠানো হয় ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর। এরপর ১৪ ডিসেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এমআরপি সেকশনের কনস্যুলার শাখা থেকে আবারও স্বরাষ্ট্র সচিবকে ই-মেইল পাঠানো হয়। ওই মেইলেও একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ই-পাসপোর্টের সব কার্যক্রম পরিচালনার অনুরোধ জানানো হয়।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। তারা বিদেশি ওই প্রতিষ্ঠান থেকে নির্ধারিত কমিশন পাওয়ার আশায় জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলেও বিষয়টি নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবছেন না।

চুক্তি না থাকলেও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুতি শেষ!

নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর দুবাইয়ের প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী গোলাম এম এ আর চিশতী স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে স্বরাষ্ট্র সচিবকে জানানো হয়, ই-পাসপোর্টের এনরোলমেন্ট কার্যক্রম শুরু করার জন্য প্রযুক্তিগত, অবকাঠামো এবং মানবসম্পদ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। যদিও তাদের সঙ্গে পূর্বের চুক্তির আওতায় এই সেবার কোনো অঙ্গীকার ছিল না।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কেবল ডিপার্টমেন্ট অব ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্টের প্রযুক্তিগত দলের সরঞ্জাম ইনস্টলেশন, কনফিগারেশন এবং নেটওয়ার্ক সংযোগ বাকি আছে। অপর একটি চিঠিতে দুবাইয়ের কনসাল জেনারেলকে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ই-পাসপোর্ট এনরোলমেন্ট প্রক্রিয়া তাদের সেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে সম্পাদনের জন্য কনসুলেট জেনারেল, দুবাই-এর সার্ভারের সঙ্গে রিয়েল-টাইম সংযোগ, সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান এবং সুরক্ষিত ডাটা ট্রান্সফার নিশ্চিত করার জন্য অবকাঠামোগত পরিবর্তন ও সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখ করেছে, এই কার্যক্রম দেশের নিরাপত্তা, বাংলাদেশের কনসুলেট জেনারেল দুবাই-এর সাফল্য ও সুনামের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল কাজ হিসেবে বিবেচিত।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তাদের প্রতিবাদ, রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ

বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ই-পাসপোর্ট প্রক্রিয়ার পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তারা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তারা উল্লেখ করেছেন, এই সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয় সংবেদনশীল তথ্য ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে পুরো দায়িত্ব না দিয়ে মিশনের নিজস্ব জনবল দিয়েই সেবা কার্যক্রম আরও নিরাপদ ও পেশাদারভাবে সম্পাদন সম্ভব। পূর্বের চুক্তির আওতায় শুধুমাত্র এমআরপি পাসপোর্ট সেবা নেওয়ার অনুরোধ করলেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দায়িত্ব গেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্বল্পমেয়াদি ‘মিশন পদায়ন’ থেকে বঞ্চিত হবেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র আরও জানিয়েছে, এই সংবেদনশীল ফাইল অনুমোদন ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কাজ করার জন্য একটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী এক নেতা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করছেন।

সূত্র অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা নিক্সন চৌধুরীর সঙ্গে বিদেশি এই কোম্পানির যোগসাজশ রয়েছে। এর আগে মালয়েশিয়ায় একই ধরনের দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ ছিল। বর্তমানে তিনি নিজের প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রতিনিধির মাধ্যমে কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। বর্তমানে তাকে সহায়তা করছেন বড় একটি রাজনৈতিক দলের একজন প্রভাবশালী নেতা। মন্ত্রণালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তাও এ কাজে সহায়তা দিচ্ছেন।

যেভাবে বেহাত হতে পারে সংবেদনশীল নাগরিক তথ্য

একাধিক সূত্র ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, ই-পাসপোর্ট সেবা পরিচালনার সঙ্গে নাগরিকের অতি সংবেদনশীল ব্যক্তিগত ও বায়োমেট্রিক তথ্য সরাসরি যুক্ত থাকে। এই কার্যক্রম কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে বিভিন্ন পর্যায়ে তথ্য বেহাত হওয়ার বাস্তব ঝুঁকি তৈরি হয় বলে মনে করছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।

প্রথম ধাপে ই-পাসপোর্ট এনরোলমেন্টের সময় আবেদনকারীর আঙুলের ছাপ, চোখের আইরিশ, মুখমণ্ডলের ছবি, ডিজিটাল স্বাক্ষর, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মসনদ, পিতা-মাতার তথ্য, ঠিকানা ও যোগাযোগসংক্রান্ত ডাটা একত্রে সংগ্রহ করা হয়। বিদেশি প্রতিষ্ঠান যদি এনরোলমেন্ট সেন্টার পরিচালনা করে বা প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকে, তাহলে তথ্য সংগ্রহ ও প্রাথমিক সংরক্ষণ পর্যায়েই রাষ্ট্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়ত, ই-পাসপোর্ট কার্যক্রমে ব্যবহৃত সার্ভার ও নেটওয়ার্কের সঙ্গে রিয়েল-টাইম সংযোগ, সফটওয়্যার কনফিগারেশন, সিস্টেম মেইনটেন্যান্স ও টেকনিক্যাল সাপোর্টের নামে বিদেশি কর্মীদের অ্যাকসেস তৈরি হলে ডাটা কপি, লগ ফাইল সংগ্রহ বা ব্যাকআপ নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব তথ্য স্থানীয় সার্ভারের বাইরে তৃতীয় পক্ষের বা ক্লাউডভিত্তিক সিস্টেমে স্থানান্তরের ঝুঁকি থাকে।

তৃতীয়ত, ই-পাসপোর্ট ডাটাবেজের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র, ইমিগ্রেশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য ভাণ্ডারের আন্তঃসংযোগ রয়েছে। ফলে কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সীমিত অ্যাকসেসও পরোক্ষভাবে বৃহৎ রাষ্ট্রীয় ডাটাবেজে প্রবেশের পথ খুলে দিতে পারে।

এ ছাড়া বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ হলে ডাটা কোথায় সংরক্ষিত হচ্ছে, কতদিন রাখা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে— এসব বিষয়ে রাষ্ট্রের পূর্ণ আইনগত ও প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে তথ্য ফাঁস হওয়া, অপব্যবহার কিংবা অন্য কোনো দেশ বা গোষ্ঠীর হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘ভয়ংকর সিদ্ধান্ত’

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে বিদেশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এমআরপি ও ই-পাসপোর্ট কার্যক্রমে যুক্ত করা রাষ্ট্রীয় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা বলেন, রাষ্ট্রীয় নাগরিক তথ্যভাণ্ডার কোনোভাবেই বেসরকারি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া যায় না। এটি শুধু প্রশাসনিক নয়, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি ঝুঁকি।

তিনি বলেন, ই-পাসপোর্ট সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত সার্ভারে রয়েছে নাগরিকদের পূর্ণ ডিজিটাল প্রোফাইল—বায়োমেট্রিক, ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ফেসিয়াল ডেটা, এনআইডি, জন্মসনদসহ অনেক স্পর্শকাতর তথ্য। যদি এই তথ্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোর মাধ্যমে প্রক্রিয়াকরণ হয়, তাহলে ডাটা লিক, ম্যানিপুলেশন বা জিও-পলিটিক্যাল অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তানভীর জোহা বলেন, আজকাল যুদ্ধ শুধু অস্ত্র দিয়ে হয় না, ডেটা দিয়েও হয়। একটি দেশের নাগরিক ডাটাবেজ মানে সেই দেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব। এই সার্বভৌমত্ব যদি বিদেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যায়, তা কার্যত ‘ডিজিটাল উপনিবেশ’ তৈরির মতো ভয়ংকর সিদ্ধান্ত।

তিনি সতর্ক করে বলেন, রিয়েল-টাইম ডেটা কানেকশন, রিমোট অ্যাকসেস ও নেটওয়ার্ক ইন্টিগ্রেশন—শুনতে নিরীহ মনে হলেও বাস্তবে এগুলো রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। একবার সিস্টেম আর্কিটেকচারে প্রবেশাধিকার তৈরি হলে কে কীভাবে ডেটা কপি করছে বা কোথায় পাঠাচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণ ও ট্র্যাক করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক তথ্য কখনোই আউটসোর্সিংয়ের বিষয় হতে পারে না। এটি কোনো বিজনেস প্রসেস নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার অবকাঠামো। এখানে ভুল মানে শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলার শামিল।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার মাসুদ আহমেদ সাইদ বলেন, ই-পাসপোর্ট ও কনস্যুলার সেবার সঙ্গে সম্পর্কিত নাগরিক তথ্য সাধারণ প্রশাসনিক তথ্য নয়। সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এটি নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। নীতিমালা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট নিষেধ অমান্য করে বিদেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে তথ্য তুলে দেওয়া হলে তা আইনের দৃষ্টিতে গুরুতর অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে গণ্য হবে।

তিনি বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় লিখিতভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে বৈদেশিক মিশনে আউটসোর্সিং সেবা ক্রয়ের সুযোগ নেই। সেই সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে অন্য কোনো মন্ত্রণালয় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এটি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের পাশাপাশি আল্ট্রা ভাইরেস- বা আইনগত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম।

সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় সর্বদা আইন, নীতিমালা ও সংবিধান মেনে কাজ করতে হয়। কোনো মন্ত্রণালয় যদি অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট অনুমোদন বা নীতিমালার স্থলচুক্তি ছাড়া সংবেদনশীল নাগরিক তথ্যের ক্ষেত্রে বিদেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেয়, তা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও আইনি কাঠামোর পরিপন্থি।

তিনি বলেন, ই-পাসপোর্ট সেবা বা অন্যান্য কনস্যুলার কার্যক্রমে নাগরিকদের বায়োমেট্রিক এবং ব্যক্তিগত তথ্য সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনার দায়ভার দেশের সার্বভৌমত্ব ও গোপনীয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব তথ্য যদি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সিস্টেম বা নেটওয়ার্কে চলে যায়, তাহলে তথ্য নিরাপত্তা, আইনি দায়বদ্ধতা এবং নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনিকে একাধিকবার কল করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)
আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

নামাজের সময়সূচি

ওয়াক্ত সময়সূচি
ফজর ৫:২৩ - ৬:৩৬ ভোর
যোহর ১২:১১ - ৩:৫৪ দুপুর
আছর ৪:০৪ - ৫:৩৬ বিকেল
মাগরিব ৫:৪১ - ৬:৫৪ সন্ধ্যা
এশা ৬:৫৯ - ৫:১৮ রাত

সোমবার ২৬ জানুয়ারী ২০২৬