সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২
ছবি-সংগৃহীত
মানব ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর ও আলোচিত অধ্যায় নূহ (আ.)-এর সময়ের মহাপ্লাবন। পবিত্র কোরআন ও বাইবেল ছাড়াও পৃথিবীর প্রাচীন সব সভ্যতার ইতিহাসে এই প্রলয়ংকরী ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়। তবে হাজার বছর ধরে একটি প্রশ্ন আজও গবেষক ও ইতিহাসবিদদের ভাবিয়ে তোলে- প্লাবনশেষে নূহ (আ.)-এর সেই ঐতিহাসিক নৌকা আসলে কোথায় নোঙ্গর করেছিল? এ বিষয়ে পবিত্র কোরআন যেমন একটি সুনির্দিষ্ট পাহাড়ের নাম ঘোষণা করেছে, তেমনি বাইবেলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে একটি বিস্তৃত পর্বতাঞ্চলের দিকে।
কোরআনের আয়াত
পবিত্র কোরআনে (সুরা হুদ:৪৪) বলা হয়েছে, ‘হে পৃথিবী! তুমি তোমার পানি শোষণ করে নাও এবং হে আকাশ! তুমি ক্ষান্ত হও। অতঃপর পানি কমে গেল এবং (আল্লাহর) সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হল, আর নৌকাটি জুদি পাহাড়ে স্থির হলো এবং বলা হলো- জালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হোক।’ এই আয়াতে একসঙ্গে মহাপ্লাবনের সমাপ্তি, নৌকার অবতরণস্থল এবং নৈতিক মূল্যায়ন উঠে আসে। তাফসিরে বলা হয়েছে, এখানে ব্যবহৃত ‘জুদি’ কোনো সাধারণ পাহাড় নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থানের নির্দেশ দেয়।
ইসলামি ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক ব্যাখ্যা
ধ্রুপদী মুফাসসিরগণ কোরআনের এই বর্ণনাকে ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। ইমাম তাবারি (রহ.) উল্লেখ করেছেন, জুদি পাহাড়টি মেসোপটেমিয়ার উত্তরাংশে, দজলা-ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকার কাছে অবস্থিত। ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, এটি মসুলের আশপাশে ‘জাজিরাতুল ইবনে ওমর’ বর্তমান তুরস্কের Cizre অঞ্চলের কাছাকাছি। এই বিবরণ থেকে বোঝা যায়, ইসলামি ঐতিহাসিক স্মৃতিতে নূহ (আ.)-এর জাতির আবাসস্থল বর্তমান ইরাক ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
বাইবেল ও প্রাচীন দলিলের বিবরণ
বাইবেলের জেনিসিস গ্রন্থে (৮:৪) বলা হয়েছে, নৌকাটি ‘Mountains of Ararat’-এ থেমেছিল। এখানে ‘Mountains’ শব্দের বহুবচন ব্যবহার ইঙ্গিত দেয় যে এটি কোনো একক শৃঙ্গ নয়, বরং বিস্তৃত পর্বতমালা। ভাষাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গবেষণায় ‘Ararat’ শব্দটিকে প্রাচীন অ্যাসিরীয় Urartu অঞ্চলের সঙ্গে চিহ্নিত করা হয়, যা বর্তমান আর্মেনিয়া, পূর্ব তুরস্ক এবং দক্ষিণে কুর্দিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত।
প্রাচীন ব্যাবিলনীয় পণ্ডিত বেরোসাস উল্লেখ করেছেন, নৌকা কর্ডুয়েন বা কুর্দিস্তান অঞ্চলের একটি পাহাড়ে থেমেছিল। গ্রিক ইতিহাসবিদ আবিদেনুস তার বর্ণনাকে সমর্থন করেছেন। তাঁর যুগে ইরাক অঞ্চলের মানুষের কাছে নৌকার কাঠের খণ্ড সংরক্ষিত থাকত এবং ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহার করা হতো। যদিও এগুলো সরাসরি প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নয়, তবু প্রাচীন ইতিহাসে এই ঘটনার গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ বহন করে।
বৈশ্বিক প্লাবন কাহিনি
নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনের আখ্যানের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ গল্প বিভিন্ন সভ্যতার সাহিত্যে পাওয়া যায়। গ্রিক, মিসরীয়, ভারতীয় ও চীনা পুরাণে প্লাবন-কাহিনী আছে। একই ধরনের আখ্যান বার্মা, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন আদিবাসী সমাজেও প্রচলিত। এই বৈশ্বিক উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে মহাপ্লাবনের স্মৃতি মানব ইতিহাসের এক প্রাচীন স্তরে প্রোথিত।
জুদি পাহাড় বনাম আরারাত
জুদি পাহাড় কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থিত, যা কোরআনের বর্ণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাইবেলে উল্লেখিত আরারাত পর্বতমালা আর্মেনিয়া থেকে দক্ষিণে কুর্দিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত। কুরআনের ‘জুদি’ এবং বাইবেলের ‘আরারাত’-এর মধ্যে মৌলিক বিরোধ নেই; বরং জুদি পাহাড়কে আরারাত অঞ্চলের একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
মুসলিমদের ঈমানি বিশ্বাস অনুযায়ী, নূহ (আ.)-এর নৌকা জুদি পাহাড়ে অবতরণ করেছে। ইসলামি ইতিহাস ও প্রাচীন ভৌগোলিক তথ্য এটিকে মসুল–Cizre–কুর্দিস্তান অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করে। বাইবেল ও প্রাচীন দলিলের ‘আরারাত’ বিস্তৃত অঞ্চলের নির্দেশ, যার মধ্যে জুদি পাহাড় অন্তর্ভুক্ত। এখনো প্রত্নতাত্ত্বিক স্পষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায়নি, কিন্তু ধর্মীয় দলিল, প্রাচীন ইতিহাস ও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্লাবন-কাহিনির উপস্থিতি এই আখ্যানের গুরুত্ব দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করে।
চূড়ান্ত মন্তব্য: নূহ (আ.)-এর নৌকার জুদি পাহাড়ে অবতরণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত। প্রমাণের জন্য বিতর্কিত প্রত্নতাত্ত্বিক দাবির ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই; শক্ত দলিল ও সতর্ক বিশ্লেষণ যথেষ্ট।
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)