রবিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩০


দুদকে অভিযোগ

রাজউকের নোটিশে নাজেহাল মোহাম্মদপুরবাসী!

জেহাদ চৌধুরী

প্রকাশিত:২৫ জানুয়ারী ২০২৪, ১৮:৫২

ছবি সংগৃহীত

ছবি সংগৃহীত

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার বাড়িওয়ালাদের ঘুম হারাম করে দিয়েছে রাজউক। বিশেষ করে বসিলা গার্ডেন সিটি এবং আরাম মডেল টাউন এলাকায় রাজউকের নকশা বহির্ভূত নির্মাণাধীন অধিকাংশ ভবন মালিক পড়েছেন চরম বেকায়দায়। রাজউক কর্তৃক একটার পর একটা কারণ দর্শানো নোটিশে নাজেহাল অবস্থা তাদের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরাম মডেল টাউনের জনৈক এক ভবন মালিক জানান, ২০২০ সালের এপ্রিলে নিজ ভূমিতে বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন তিনি। তখন এলাকাটি রাজউকের মহাপরিকল্পনার আওতায় ছিলো না। যে কারনে তিনি রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই ভবন নির্মাণ শুরু করেন। বর্তমানে চারতলার কাজ চলছে। বিষয়টি নজরে আসার পর গত বছর (২০ নভেম্বর ও ১৩ ডিসেম্বর) তাকে পরপর দুুটি কারণ দর্শানোর নোটিশ করেন রাজউক জোন ৫/১ এর অথরাইজড অফিসার প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন। ২য় নোটিশ পাবার পর নির্মাণকাজ বন্ধ রেখে ওইদিনই রাজউকের অনুমোদন পেতে অনলাইনে আবেদন করেন তিনি, যার স্মারক নং-এ-০১০০৫.২৩.১১১.৩৫.১০১। রাজউকের নোটিশের পর থেকেই দুশ্চিন্তায় আছেন ওই ভবন মালিক। ইতোমধ্যে যে ভবনটির চারতলা নির্মাণাধীন, রাজউক কী আদৌ সেই ভবনের অনুমোদন দিবে? অথবা অনলাইনে করা আবেদনটি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে কি না- এ বিষয়েও সন্দিহান তিনি।

এদিকে রুহুল পারভেজ নামে জনৈক ব্যক্তি সম্প্রতি দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন) চেয়ারম্যান বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন। রাজউক (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) জোন ৫/১ এর অথরাইজড অফিসার ও একই জোনের ইমারত পরিদর্শকের নামে করা ওই অভিযোগে রুহুল পারভেজ বলেন, “অথরাইজড অফিসার প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইমারত পরিদর্শক বাপ্পি বিশ্বাসের নোটিশ বাণিজ্যে মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকার ডেভেলপার কোম্পানি ও বাড়ির মালিকগণ অতিষ্ঠ। এলাকায় বিভিন্ন মেয়াদে গড়ে ওঠা নকশা বহির্ভূত বহুতল ভবন চিহ্নিত করে নোটিশের নামে ভবন মালিকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন মামুন-বাপ্পি সিন্ডিকেট। বসিলা এলাকায় নির্মাণাধীন বিভিন্ন ভবন ঘুরে ঘুরে গত ৬ মাসে ৫ শতাধিক নোটিশ করেছেন তারা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরপর ২টি নোটিশ করেন। এরপর চূড়ান্ত নোটিশ শেষে উচ্ছেদ প্রস্তাব করার নিয়ম থাকলেও তা না করে ডেভেলপার কোম্পানির প্রতিনিধি এবং ভবন মালিকদের ডেকে নিয়ে তাদের সঙ্গে দেন-দরবারে বসেন মামুন-বাপ্পি সিন্ডিকেট। আলোচনা সন্তোষজনক না হলে, নানা ভয়ভীতি ও কারসাজি চলতে থাকে। এভাবে নোটিশ বাণিজ্যের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ভবন থেকে নিয়মিত মোটা অংকের মাসোহারা আদায় করছেন মামুন-বাপ্পি।”

অভিযোগে উল্লেখ, “সম্প্রতি বসিলা গার্ডেন সিটি এবং আরাম মডেল টাউনে নকশা বহির্ভূত নির্মাণাধীন প্রায় ২০টি বাড়ি থেকে (উচ্ছেদ কিংবা নোটিশ করা হবে না মর্মে) ২ কোটি টাকা চুক্তি করেছেন অথরাইজড অফিসার আবদুল্লাহ আল মামুন। মামুনের আস্থাভাজন ও ১নং ক্যাশিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ইমারত পরিদর্শক বাপ্পি বিশ্বাস। গত বছরের সেপ্টেম্বরে গাজীপুরে বদলী করা হলেও মাত্র ১ মাসের ব্যবধানে ১৫ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে রাজউকের অত্যন্ত লোভনীয় জোন ৫/১ এ ফিরে আসেন বাপ্পি বিশ্বাস। আর নতুন এলাকায় দায়িত্ব নিয়েই বেপরোয়া নোটিশ বাণিজ্যের মাধ্যমে দু’হাতে টাকা কামাচ্ছেন মামুন-বাপ্পি সিন্ডিকেট।”

রাজউক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে রাজউক জোন ৫/১ এর আওতাধীন ঢাকার পশ্চিমাঞ্চল তথা মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ, ঢাকা উদ্যান ও বসিলা এলাকায় ১৯৮৮ সাল থেকে ভূমি উন্নয়ন কাজ শুরু হয়। ২০১০ সালের ঢাকা মহানগর বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) এগুলো বন্যা প্লাবন ভূমি দেখানো হয়েছিল। যে কারনে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত উল্লেখিত এলাকায় ভবন নির্মাণের পারমিশন দেয়নি রাজউক। কিন্তু এর আগেই এ এলাকার প্রায় ৭০ ভাগ অংশে ভবন নির্মিত হয়েছে। যার প্রায় সবগুলোই রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে নির্মাণ করা হয়েছে এবং ৭৫ শতাংশ ভবনের উচ্চতা ছয়তলার অধিক। তবে, সদ্য প্রকাশিত (ড্যাপ) ২০১৬-৩৫-এ মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ, ঢাকা উদ্যান ও বসিলাকে আবাসিক এলাকা হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফলে ২০২২ সালের জুলাই থেকে ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন পাচ্ছেন এ এলাকার মানুষ। পাশাপাশি ছোটখাটো ব্যবসা পরিচালনারও অনুমতি পান এলাকার বাসিন্দারা। ইতোমধ্যে যে ভবনগুলো রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে নির্মাণ করা হয়েছে কিন্তু ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছে, তারা নির্দিষ্ট ফি’র ১০ গুণ জরিমানা দিয়ে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট নিতে পারবে বলেও ঘোষণা দেয় রাজউক।

রাজউকের এমন ‘হঠাৎ সিদ্ধান্তে’ বিপত্তি দেখা দিয়েছে। বিপাকে পড়েছেন বসিলা গার্ডেন সিটি এবং আরাম মডেল টাউন এলাকার নকশা বহির্ভূত নির্মাণাধীন অধিকাংশ ভবন মালিক। ক্ষোভ প্রকাশ করে তাদের কেউ কেউ বলেন, ‘মূলতঃ এই সুযোগকেই কাজে লাগিয়েছেন মামুন ও বাপ্পি বিশ্বাস। ইমারত নির্মাণ আইনের ৩/বি ধারার দোহাই দিয়ে তারা এখন নির্মাণাধীন ভবন খুঁজে খুঁজে সমানে কারণ দর্শানোর নোটিশ করছেন।’

এ প্রসঙ্গে রাজউক জোন ৫/১ এর অথরাইজড অফিসার আবদুল্লাহ আল মামুনের কাছে জানতে চাইলে তিনি দৈনিক সময়কে বলেন, এটা রাজউকের নিয়মিত রুটিন ওয়ার্ক। আমরা কারণ দর্শানো নোটিশ করে ভবন মালিকদের বলেছি- তারা যেন ছাড়পত্রের জন্য রাজউকের অনলাইনে আবেদন করেন। তাছাড়া মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকায় ইতিপূর্বে যারা নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ করেছেন এবং তাদের মধ্যে যারা রাজউকের নিয়ম মেনে করেছেন, তারা রাজউকের নির্ধারিত জরিমানা দিয়ে নকশা নিতে পারবেন। ‘নোটিশের নামে হয়রানি’ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মিথ্যা কথা। দুদকে চাইলে যে কেউ-ই যে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারে। আমি কারো কাছ থেকে কোন সুবিধা নেই নাই। প্রয়োজনে দুদক আমার বিরুদ্ধে তদন্ত করে দেখুক। এসব বানোয়াট, ভিত্তিহীন।’

রাজউকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টানা দুই বছর জোন ৫/১ এর দায়িত্বে ছিলেন ইমারত পরিদর্শক বাপ্পি বিশ্বাস। ২০২৩ সালের ৩ আগষ্ট বাপ্পিকে গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (গাউক) বদলী করা হয়। কিন্তু সেখানে একদিনও অফিস করেননি তিনি। মাত্র ২৪ দিনের মাথায় আবার রাজউকের জোন ৫/১ এ ফিরে আসেন বাপ্পি।

রাজউকের একটি সূত্র বলছে, নিয়ম অনুযায়ী দুই বছর পর পর সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বদলী হবেন- এটাই স্বাভাবিক। আর নিয়মতান্ত্রিকভাবেই বাপ্পি বিশ্বাসকে বদলী করেছে রাজউক। কিন্তু তিনি একদিনের জন্যেও বদলীকৃত কর্মস্থলে যোগ দেন নাই। কোন ক্ষমতাবলে বাপ্পি আবার তার আগের জায়গায় ফেরত আসলেন? জোন ৫/১ এ নিশ্চই ‘কিছু’ আছে বলে দাবী সূত্রটির।

এ বিষয়ে ইমারত পরিদর্শক বাপ্পি বিশ্বাসের মোবাইলে কল করে জানতে চাইলে তিনি দৈনিক সময়কে বলেন, রাজউকের নিয়ম অনুযায়ী নোটিশ করেছি। কাউকে হয়রাণি করি নাই, কারো কাছ থেকে কোন নগদ টাকা পয়সা কিংবা কোনপ্রকার অনৈতিক সুবিধা নেই নাই। ‘১৫ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে পূর্বের জায়গায় ফেরত এসেছেন’- এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং সরাসরি অফিসে গিয়ে কথা বলতে বলেন।

ইমারত পরিদর্শক বাপ্পি বিশ্বাসের বদলী এবং নতুন কর্মস্থলে যোগ না দেওয়া প্রসঙ্গে রাজউকের পরিচালক (প্রশাসন) মমিন উদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি দৈনিক সময়কে বলেন, বাপ্পি বিশ্বাসকে গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (গাউক) বদলী করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি সেখানে যোগদান না করে তার পুরনো কর্মস্থলে যোগদান করেছেন, এর পেছনে নিশ্চই যৌক্তিক কারণ ছিলো। এখানে কোন অনিয়ম কিছু হয় নি।

এদিকে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ, ঢাকা উদ্যান ও বসিলা এলাকার নকশা বহির্ভূত নির্মাণাধীন ভবন প্রসঙ্গে অতিসম্প্রতি রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মোঃ আশরাফুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘যে এলাকায় ইতোমধ্যে ৭০ ভাগ অংশে ভবন নির্মিত হয়েছে, যেখানে ৭৫ শতাংশ ভবনের উচ্চতা ছয়তলার কম নয়, এ জায়গাকে আমরা যদি বলি এটা বন্যাপ্রবাহ এলাকা তাহলে নিরেট বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হবে। আরও অপরিকল্পিত ভবনকে উৎসাহিত করা হবে।’

তিনি আরও বলেছেন, ‘ওই এলাকার ৭০ ভাগ ভবন ভাঙ্গা যৌক্তিক কিনা, সম্ভব কিনা এবং এটা করতে আমাদের কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবল ও যান-যন্ত্রপাতির সক্ষমতা আছে কিনা, আমাদের মতো অর্থনীতিতে এটা সমর্থন করে কিনা- এসব ভেবে দেখতে হবে। তার চেয়ে আমরা যদি তাদেরকে বলি তোমরা কিছু পার্ক রাখ, খালগুলোকে সংস্কার করো, রাস্তাগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ করো- তাহলেই একটা পরিকল্পনার আওতায় আসবে।’

ইতোমধ্যে যারা ভবন নির্মাণ করেছেন তাদের অকুপেন্সি সার্টিফিকেট নিতে হলে কী করতে হবে জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, ‘ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী কারও ভবনের সোটব্যাক ঠিক থাকে, রাস্তার প্রশস্ততা অনুযায়ী ভবনের ফার (FAR) ঠিক থাকে তাহলে তিনি দশগুণ জরিমানা দিয়ে বৈধতার সুযোগ পাবেন- যা আইনেই আছে।’

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)
আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

নামাজের সময়সূচি

ওয়াক্ত সময়সূচি
ফজর ৫:১০ ভোর
যোহর ১২:১২ দুপুর
আছর ৪:২১ বিকেল
মাগরিব ৫:৫৮ সন্ধ্যা
এশা ৭:১৪ রাত

রবিবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪