শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
দেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে চার শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এটি শুধু স্বাস্থ্য সংকট নয়; বরং দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা, টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অব্যবস্থাপনার প্রতিফলন।
শনিবার (১৬ মে) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট আয়োজিত ‘হামে শিশুমৃত্যু : জনস্বাস্থ্য সংকট ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১৪ মে পর্যন্ত দেশে অনেক শিশু হাম ও উপসর্গে মারা গেছে। এ সময়ে দেশে প্রায় ৫৫ হাজার শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৯ হাজার ১৬০ জন। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশে সাধারণত ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুরা হামে বেশি আক্রান্ত হলেও এবার ৯ মাসের আগেই অনেক শিশু সংক্রমিত হয়েছে। হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হওয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার চার দিন আগে থেকে এবং চার দিন পর পর্যন্ত অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। সময়মতো পূর্ণমাত্রায় টিকা নিলে হাম প্রতিরোধ সম্ভব হলেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি টিকা সংগ্রহ, মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে এনেছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, হামের জটিলতা প্রতিরোধে ভিটামিন-এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আগে সরকারি কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের প্রতি ছয় মাস অন্তর ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই কার্যক্রম বন্ধ থাকায় মৃত্যুঝুঁকি বেড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সারাদেশে গণটিকাদান কর্মসূচি জোরদার, সরকারি হাসপাতালে বিশেষ হাম কর্নার চালু, নিয়মিত ভিটামিন-এ কর্মসূচি পুনরায় চালু, প্রান্তিক শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসা, টিকা উৎপাদনে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যখাতে শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ এবং কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা পর্যায়ে জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম জোরদারের দাবি জানান বক্তারা।
তারা আরও বলেন, জাতীয় বাজেটের অন্তত ১৫ শতাংশ এবং জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ দিতে হবে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্যকে জনগণের মৌলিক অধিকার হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বানও জানান তারা। কোভিড-১৯ মহামারি থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরও বাংলাদেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্য খাতকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বর্তমান হাম পরিস্থিতি ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা।
শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. কাজী রকিবুল ইসলাম বলেন, দেশে বয়স্ক ও নবজাতকদের জন্য আইসিইউ থাকলেও পর্যাপ্ত পিআইসিইউ নেই। এবার ৯ মাসের আগেই শিশুদের আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনক।
তিনি আরও বলেন, মায়ের দুধ খাওয়ানোর বিষয়ে আগের মতো প্রচার-প্রচারণা না থাকায় ব্রেস্টফিডিংয়ের হার কমে গেছে। পাশাপাশি কোভিড-পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্য ও মাতৃ পুষ্টিহীনতা বাড়ায় তার প্রভাব শিশুদের ওপরও পড়ছে। শিশুমৃত্যু ঠেকাতে আইসোলেশন ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, হামে এখনো যেভাবে শিশুমৃত্যু হচ্ছে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। টিকাদানে গাফিলতি, জনস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব না দেওয়া এবং কিছু ভুল নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণেই আমরা এ সংকটে পড়েছি। জনস্বাস্থ্যকে অবহেলার ফলই বর্তমান হাম সংকট। জনস্বাস্থ্যকে কোনো সরকারই কখনো গুরুত্ব দেয়নি।