সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩


সুদিন ফিরছে সোনালী আঁশে, কৃষকের মুখে হাসি

গাইবান্ধা থেকে

প্রকাশিত:৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪২

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

চলতি মৌসুমের ভরা বাজারে গাইবান্ধায় পাটের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। কৃষকদের ভাষ্য, অন্তত গত ১০ বছরের মধ্যে ভরা মৌসুমে পাটের এই দাম পাননি তারা। ফলে উৎপাদন খরচ মিটিয়ে এবার লাভের মুখ দেখছেন চাষিরা। দীর্ঘদিনের হতাশা কাটিয়ে আবারও আশার আলো দেখছেন গাইবান্ধার পাটচাষিরা। তবে আশঙ্কা কাটেনি সিন্ডিকেটের খপ্পরের!

সরেজমিনে গেল শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকালে জেলার উল্লেখযোগ্য ফুলছড়ি উপজেলার ফুলছড়ি হাটে গিয়ে দেখা যায়, উৎসব মুখর পরিবেশে চলছে পাটের বেচা-কেনা। ভোর-সকাল থেকেই নৌকায় করে পাট বিক্রি করতে আসছেন চরাঞ্চলের চাষিরা। হাটের মাঠের পাশাপাশি নৌকাতেও চলছে ক্রয়-বিক্রয়। এসময় হাসি-খুশি মুখ দেখা যায় কৃষকদের। কৃষকরা প্রশ্নের জবাবও দেন প্রাণোচ্ছ্বল ভাবেই। হাটে মানভেদে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে স্বর্বনিম্ন তিন হাজার ৮০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ চার হাজার ১০০ টাকায়। যা গেল অন্তত ১০ বছরের মধ্যে পাটের ভরা মৌসুমের সর্বোচ্চ মূল্য বলে জানান কৃষকরা।

অন্যদিকে, উপজেলার উদাখালি, উড়িয়া, ফজলুপুর ও কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায় পাট শুকানো ও ছেলার কাজ করছেন চাষিরা। কেউ কেউ প্রস্তুত করছেন বিক্রির জন্যও। অনেক কৃষক পাট ও পাটকাটি শুকাচ্ছেন পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে নিয়ে। এসময় পাট নিয়ে স্বপ্নবোনা কৃষকদের চোখে-মুখে ছিল হাসির ঝিলিক।

এবার লাভের ভাগে কৃষক

পাটচাষিরা জানান, গেল বেশ কয়েক বছর থেকেই পাটের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার হতাশা থাকলেও এবছর লাভের মুখ দেখছেন তারা। কেননা, তিন হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ১০০ টাকা পাটের দাম তারা অন্তত ১০ বছরের মধ্যে পাননি। আর এবছর পাল্টেছে সেই চিত্র।

ফুলছড়ির হাটে পাট বিক্রি করতে আসা ফুলছড়ি ইউনিয়নের বাগবাড়ি এলাকার পাটচাষি আব্দুস সালাম বলেন, এবার পাটের দামে আমরা খুশি। এমন বাজার থাকলে আমরা পাটের আবাদ করব।

অপর কৃষক আবেদ আলী ব্যাপারি বলেন, সব খরচ বাদে এবার লাভ হচ্ছে কৃষকদের। ভরা বাজারে গত ৮/১০ বছর পর এমন দাম পাচ্ছি আমরা। তবে এই দাম কতদিন থাকবে সেটি নিয়ে শঙ্কার কথা জানান তিনি।

জামালপুরের ঘুটাইল বাজার থেকে আসা পাইকারি পাট ক্রেতা খোরশেদ আলম বলেন, সবচেয়ে ভালমানের পাট ক্রয় করা হচ্ছে ৪ হাজার ৫০ থেকে ১০০ টাকায়, মাঝারি মানের পাট ৩ হাজার ৯০০ থেকে ৪ হাজার আর তুলনামূলক নিম্নমানের পাট ক্রয় করছি ৩ হাজার ৮০০ টাকায়। এ বছর পাটের দাম অনেক ভালো।

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী জেলায় পাট চাষাবাদের ৫ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছর ১৭০ হেক্টর জমিতে পাটচাষ বৃদ্ধি পেয়ে ১৩ হাজার ৯৮৭ হেক্টর এবং গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে ২৭ হেক্টর বৃদ্ধি পেয়ে পাটচাষ হয়েছিলো ১৩ হাজার ৮১৭ হেক্টর জমিতে। কিন্তু তার আগের বছরগুলোতে ভয়াবহভাবে কমেছে পাটের আবাদ।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২২ সালে জেলার সাত উপজেলায় ১৬ হাজার ৪৬০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে বিস্ময়করভাবে ১৪০০ হেক্টর কমে গিয়ে তা ১০ হাজার ৫০০ হেক্টরে নামে এবং ২০২৪ সালে আরো ১২১০ হেক্টর কমে জেলায় ১৩ হাজার ৭৯০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয় পাট।

এছাড়া অন্যদিকে, চলতি বছরসহ কোনও বছরই চাষাবাদে এবং পাট উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগ। যদিও সার-বীজের সরকারি প্রণোদনা কার্যক্রম সচল রেখেছে সরকার। চলতি বছর ১৩ হাজার ৯৮৭ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে পাট। এর বিপরীতে উৎপাদন ধরা হচ্ছে ৩৪ হাজার ৯৮৭ টন। এছাড়া এবছর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪৮ হেক্টর জমির ফসল।

সিন্ডিকেটের প্রভাব

স্থানীয় কৃষকরা জানান, বন্যা-খরাসহ নানা দুর্যোগের ঝুঁকি, হারভাঙ্গা খাটুনি আর ধার-দেনা করে পাট চাষ করেন কৃষকেরা। আর তাদের উৎপাদিত পণ্যের দাম নির্ধারণ করেন পাটকল মালিক, ফরিয়া- ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটরা। যার কারণে প্রায় বছরই পাট চাষে পুঁজি হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষক। ফলে চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়েছেন অনেক স্থানীয় কৃষক। যদিও গেল দুবছর থেকে আবার ধীর গতিতে বাড়ছে পাটের আবাদ।

পাটচাষিদের অভিযোগ, অন্যান্য বছরেও পাটের এমন দাম গেলেও তা কৃষকের ভাগ্যে জোটেনি। কৃষকের হরভাঙা খাটুনিতে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য কেড়ে নিয়েছে সিন্ডিকেট। কেননা, ভরা মৌসুমের যে সময়ে কৃষকরা পাট বিক্রি করেন ঠিক সেই সময়ে মিল মালিকরা কম দাম ছাড়া পাট ক্রয় করেন না। ফলে বাধ্য হয়ে অর্ধেক দামে পাট বিক্রি করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কৃষকরা।

কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের উত্তর রসূলপুরের কৃষক ফারুক হোসেন বলেন, যখন এই অঞ্চলের শতকরা ৯০ ভাগ কৃষকের ঘরে পাট থাকেনা তখন ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে পাট ক্রয় করেন। ফলে লাভবান হয় ফরিয়া-মিল মালিক ও মধ্যসত্বভোগীরা। আর ক্ষতিগ্রস্ত হই আমরা কৃষকরা। তবে এবছর পাল্টেছে সেই চিত্র। এসময় তিনি বর্তমান বাজার ধরে রাখতে সরকারের প্রতি আবেদন জানান।

খোলাবাড়ির কৃষক জাহাঙ্গীর আলম সরকার বলেন, পাটচাষিদের পাটকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে সকল হিসেব-নিকেশ। তারা ভরা মৌসুমেপাট বিক্রি করে সংসারের ব্যয়, ধার-দেনা পরিশোধসহ সাংসারিক যাবতীয় কাজ করেন। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য পেতে এ বছরের মতো সব সময়ই শুরু থেকেই পাট ক্রয়-বিক্রয়ে সরকারের নজরদারির দাবি করেন তিনি।

মিলারদের টপকিয়ে পাট কিনছেন ব্যবসায়ীরা

হাটের একাধিক সূত্র ও স্থানীয় সচেতন কৃষকরা জানান, মিলারদের টপটিয়ে বর্তমান বাজারে পাট ক্রয় করছেন স্টোক করে রাখে-এমন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। তারা মিলার ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের থেকেও মণ প্রতি ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে পাট ক্রয় করছেন। ফলে পাটের দাম বেড়েছে। নতুবা এবছরও সিন্ডিকেটে জিম্মি হতো পাটের বাজার।

ফুলছড়ি হাটে পাট বিক্রি করতে আসা পাটচাষি আলফাজ আলী বলেন,“এবছর এখন বাজারে দাম ভালো, কিন্তু এমন ভরা মৌসুমে পাটের এই দাম ছিলোনা দীর্ঘদিন। বাধ্য হয়ে মাত্র ১৮০০ থেকে ২৫০০ টাকায় পাট বিক্রি করতে হয়েছে আমাদের। আর বিক্রির কয়েক সপ্তাহ পরেই দেখা যায় সেই পাটই হাটে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হয়েছে।

ফুলছড়ি হাটের পাটের বড় ব্যবসায়ী কাজল বলেন, স্টোকাররা ভালো মানের পাট মণপ্রতি ৪১০০ টাকা পর্যন্ত কিনছেন। ফলে কৃষক এবছর লাভবান হচ্ছেন। তিনি জানান, মিলাররা এই দামে পাট কিনছেনা, ফলে আমরাও কিনতে পারছিনা।

এসময় সিন্ডিকেট প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা স্থানীয়ভাবে পাট ক্রয় করি ঠিকই। আমরা নিজেরা দাম নির্ধারণ করিনা। আমাদেরকে পাটকল মিল মালিকরা যে দামে কিনতে বলেন, সেই দামেই পাট কিনতে হয়। এখানে আমাদের কিছু নেই।

পাটচাষি জিয়ারত উদ্দিন বলেন, আমরা চরের মানুষ এই মৌসুমে চরাঞ্চলে পাট ছাড়া কোনো আবাদ হয়না। বাধ্য হয়ে পাটই করতে হয়। কিন্তু সিন্ডিকেটে না ভাঙলে কৃষকদের বাঁচানো সম্ভব নয়। পাটচাষে একদিকে আবার বন্যাসহ নানা ঝুঁকি, অন্যদিকে বাজারে সিন্ডিকেট। সরকারের উচিৎ কৃষকদের পক্ষে থেকে সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া।

এ প্রসঙ্গে গাইবান্ধার উন্নয়ন সংগঠক সাদ্দাম হোসেন বলেন, দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি দেশের কৃষকরা। কৃষিনির্ভর এ জেলায় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে কৃষককে আগে বাঁচাতে হবে।

তিনি বলেন, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পাট কেনা হচ্ছে না। ফলে লাভবান হচ্ছেন ফড়িয়া-পাইকারেরা। হাটে-হাটে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র খুলে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পাট কেনা হলে কৃষকরা অবশ্যই লাভবান হবেন।

এছাড়া সরকারি পাটকলগুলো চালু এবং পাটজাত পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়াসহ পণ্যের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারে প্রতি আহবান জানান তিনি। অন্যথায় এই সোনালী আঁশে (পাট চাষে) আগ্রহ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) আসাদুজ্জামান বলেন, গাইবান্ধায় বর্তমানে পাটের বাজার ভালো। অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি পাটের আবাদ বাড়াতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।

জেলায় এ বছর দুই হাজার বিঘা জমির জন্য দুই হাজার ১০০ কৃষককে এক কেজি করে বীজ এবং ৫ কেজি করে ডিএপি ও ৫ কেজি এমওপিসহ ১০ কেজি করে সার দেওয়া হয়েছে। ভালো উৎপাদন করতে তাদেরকে পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। একই সাথে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সব বিভাগকে একযোগে কাজ করতে হবে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

নামাজের সময়সূচি

ওয়াক্ত সময়সূচি
ফজর ৪:২৫ - ৫:৩৭ ভোর
যোহর ১১:৫৭ - ৪:১৬ দুপুর
আছর ৪:২৬ - ৬:০৭ বিকেল
মাগরিব ৬:১২ - ৭:২৩ সন্ধ্যা
এশা ৭:২৮ - ৪:২০ রাত

সোমবার ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬