সোমবার, ৪ মে ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩


প্যালিও ডায়েট: আদিম মানুষের খাদ্যাভ্যাসে ফেরার গল্প

ফাহিমা হোসেন মুনা

প্রকাশিত:৪ মে ২০২৬, ১৩:৫৮

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

প্যালিও ডায়েট বর্তমান বিশ্বে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি খাদ্যপদ্ধতি। এই ডায়েটের মূল ধারণা হলো আমাদের পূর্বপুরুষ, প্রস্তর যুগের শিকারি-সংগ্রাহক মানুষেরা যেভাবে খেতেন, ঠিক সেভাবে খাওয়া। "প্যালিও" শব্দটি এসেছে "প্যালিওলিথিক" থেকে, যার অর্থ প্রাচীন প্রস্তর যুগ। প্রায় ২৫ লাখ থেকে ১০ হাজার বছর আগে মানুষ যা খেত, তার উপর ভিত্তি করেই এই ডায়েট তৈরি।

প্যালিও ডায়েটের মূল দর্শন
এই ডায়েটের পেছনে একটি সহজ যুক্তি আছে আমাদের শরীর বিবর্তনের মাধ্যমে প্রাচীন খাদ্যের সাথে মানিয়ে উঠেছিল। কিন্তু কৃষি বিপ্লবের পর থেকে মানুষ শস্য, চিনি এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার খেতে শুরু করেছে, যা শরীর এখনো পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেনি। প্যালিও ডায়েটের সমর্থকরা মনে করেন, আধুনিক রোগব্যাধি যেমন, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্থূলতা — এই খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের কারণেই হচ্ছে।

প্যালিও ডায়েটে সাধারণত নিম্নলিখিত খাবারগুলো অনুমোদিত:

- মাংস ও প্রোটিন:গরু, মুরগি, মাছ, ডিম, সামুদ্রিক খাবার বিশেষত ঘাস খাওয়া পশুর মাংস এবং বনের মাছ সবচেয়ে ভালো বলে বিবেচিত।
- শাকসবজি: সব ধরনের সবুজ শাকসবজি, গাজর, মিষ্টি আলু, ব্রকলি, পালং শাক ইত্যাদি।
- ফলমূল: আম, কলা, আপেল, বেরি জাতীয় ফল — তবে পরিমিত পরিমাণে।
- বাদাম ও বীজ: আমন্ড, আখরোট, কাজু, চিয়া বীজ ইত্যাদি।

স্বাস্থ্যকর তেল: অলিভ অয়েল, নারকেল তেল, অ্যাভোকাডো তেল।

প্যালিও ডায়েটে সম্পূর্ণ কি বাদ দিতে হয়:
- শস্যজাতীয় খাবার:ভাত, রুটি, পাস্তা, ওটস
- ডাল ও লেগুম: মসুর ডাল, ছোলা, শিম, বাদাম
- দুগ্ধজাত পণ্য:*দুধ, দই, পনির, মাখন
- চিনি ও মিষ্টি: চকোলেট, কোল্ড ড্রিংক, প্যাকেটজাত মিষ্টি
- প্রক্রিয়াজাত খাবার: চিপস, ফাস্টফুড, টিনের খাবার
- পরিশোধিত তেল: সয়াবিন তেল, সানফ্লাওয়ার তেল

প্যালিও ডায়েটের উপকারিতা। গবেষণা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই ডায়েটের বেশ কিছু উপকার দেখা গেছে:

ওজন কমানো:
উচ্চ প্রোটিন ও ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে, ফলে ক্যালোরি গ্রহণ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায় এবং ওজন হ্রাস পায়।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ:
প্রক্রিয়াজাত কার্বোহাইড্রেট বাদ দেওয়ার ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্থিতিশীল থাকে, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী।
প্রদাহ কমানো:
প্যালিও খাদ্যে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান বেশি থাকে, ফলে শরীরের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ কমতে পারে।
হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস:
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, প্যালিও ডায়েট খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) কমাতে এবং ভালো কোলেস্টেরল (HDL) বাড়াতে সাহায্য করে।
হজমশক্তি উন্নতি:
প্রক্রিয়াজাত খাবার বাদ দিলে অনেকের পেটের সমস্যা, গ্যাস ও অস্বস্তি কমে যায়।

প্যালিও ডায়েট সম্পূর্ণ বিতর্কমুক্ত নয়। পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকদের অনেকে এর বিরুদ্ধেও মত দেন।

প্রথমত, ডাল ও দুগ্ধজাত খাবার বাদ দেওয়ায় ক্যালসিয়াম ও কিছু ভিটামিনের ঘাটতি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, এই ডায়েটে মাংসের উপর বেশি নির্ভরতা থাকে, যা পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ বা ভারতের মতো দেশে ভাত ও ডাল ছেড়ে এই ডায়েট মেনে চলা বাস্তবে বেশ কঠিন এবং ব্যয়বহুল।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্যালিও
আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় ভাত, ডাল, রুটি মূল ভূমিকায় থাকে। তাই প্যালিও ডায়েট সম্পূর্ণভাবে মানা কঠিন। তবে আংশিকভাবে এর নীতি অনুসরণ করা যায় যেমন, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও চিনি কমানো, বেশি শাকসবজি ও মাছ খাওয়া এবং ভাজাপোড়া থেকে দূরে থাকা।

প্যালিও ডায়েট শুধু একটি ট্রেন্ড নয়, এটি একটি জীবনদর্শন — প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার প্রয়াস। তবে যেকোনো ডায়েট শুরু করার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ প্রতিটি মানুষের শরীর আলাদা, এবং একটি ডায়েট সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর নাও হতে পারে।
লেখক- ফাহিমা হোসেন মুনা গবেষণা দলের প্রধান, BESS; প্রতিষ্ঠাতা ও কন্টেন্ট রাইটার, Antioxidant Pathways।

লেখক: ফাহিমা হোসেন মুনা। গবেষণা দলের প্রধান, BESS; প্রতিষ্ঠাতা ও কন্টেন্ট রাইটার, Antioxidant Pathways।

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)
আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

নামাজের সময়সূচি

ওয়াক্ত সময়সূচি
ফজর ৪:০২ - ৫:১৮ ভোর
যোহর ১১:৫৫ - ৪:২২ দুপুর
আছর ৪:৩২ - ৬:২৩ বিকেল
মাগরিব মাগরিব ৬:২৮ - ৭:৪৪ সন্ধ্যা
এশা ৭:৪৯ - ৩:৫৭ রাত

সোমবার ৪ মে ২০২৬