মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ২৯ বৈশাখ ১৪৩৩


লিভার ডিটক্সিফাইং : ট্রেন্ড নাকি অভ্যাস

ফাহিমা হোসেন মুনা

প্রকাশিত:১২ মে ২০২৬, ১৮:৩২

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

সকালে ঘুম থেকে উঠেই এক গ্লাস “ডিটক্স ওয়াটার”।কেউ লেবু-শসা ভিজিয়ে খাচ্ছেন, কেউ আবার সাত দিনের “লিভার ক্লিনজ” ডায়েটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই দেখা যায়,“লিভার নোংরা হয়ে গেছে”, “শরীরের সব টক্সিন বের করুন”, “এই জুস খেলেই লিভার একদম নতুন”।

শুনতে আকর্ষণীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি আমাদের লিভার এত সহজে “নোংরা” হয়ে যায়? আর কয়েক গ্লাস জুস বা হারবাল পানীয় কি সত্যিই সেটিকে “ডিটক্স” করতে পারে?

মানুষের শরীরে এমন একটি অঙ্গ আছে, যা প্রতিদিন নিঃশব্দে আমাদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে কোনো বিজ্ঞাপন ছাড়াই, কোনো “ডিটক্স প্যাকেজ” ছাড়াই। সেই অঙ্গটির নাম লিভার।

লিভার শরীরের রাসায়নিক কারখানা। আমরা যা খাই, পান করি, এমনকি অনেক ওষুধও, সবকিছুকে ভেঙে শরীরের জন্য নিরাপদ করে তোলে এই অঙ্গ। বিষাক্ত পদার্থ ছেঁকে ফেলা, হজমে সহায়তা করা, শক্তি জমা রাখা, প্রোটিন তৈরি করা একসাথে শত শত কাজ করে যায় এটি। অর্থাৎ, লিভার নিজেই শরীরের সবচেয়ে বড় “ডিটক্স মেশিন”।

কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন আমরা “ডিটক্স” শব্দটিকে ম্যাজিক ভাবতে শুরু করি।অনেকেই মনে করেন, কয়েকদিন বেশি তেল-মসলাযুক্ত খাবার খাওয়ার পর বা রাত জাগার পরে কোনো বিশেষ পানীয় খেলেই লিভার আবার পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে যাবে। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। লিভারকে ক্ষতি করে ধীরে ধীরে জমে ওঠা অভ্যাসগুলো যেমন, অতিরিক্ত ফাস্টফুড, নিয়মিত কোমল পানীয়, ধূমপান, অ্যালকোহল, অনিয়ন্ত্রিত ওষুধ সেবন, কম ঘুম, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থূলতা।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, “ডিটক্স” নামে বাজারে প্রচলিত অনেক পণ্য বা ডায়েটের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দুর্বল। কিছু ক্ষেত্রে এগুলো উপকারের বদলে ক্ষতিও করতে পারে। বিশেষ করে অনিয়ন্ত্রিত হারবাল সাপ্লিমেন্ট বা অতিরিক্ত উপবাস শরীরের উপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। এমনকি কিছু “হারবাল ডিটক্স” পণ্যের কারণেও লিভার ইনজুরির ঘটনা বিশ্বজুড়ে বেড়েছে।

সবচেয়ে বড় ভুলটি হয় তখন, যখন মানুষ আসল রোগের লক্ষণকে “টক্সিন” ভেবে অবহেলা করে।

অস্বাভাবিক ক্লান্তি, চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া, পেট ফেঁপে থাকা, ক্ষুধামন্দা— এগুলো কখনোই সাধারণ “ডিটক্সের প্রয়োজন” নয়। এগুলো হতে পারে গুরুতর লিভার রোগের লক্ষণ। বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্যাটি লিভার এখন শহর থেকে গ্রাম সব জায়গাতেই বাড়ছে। আগে যেটিকে মধ্যবয়সীদের সমস্যা ভাবা হতো, এখন অনেক তরুণ-তরুণীর মধ্যেও সেটি দেখা যাচ্ছে। সারাদিন বসে থাকা, অতিরিক্ত প্রসেসড খাবার, অনিয়মিত জীবনযাপন এবং মানসিক চাপ সব মিলিয়ে লিভার ধীরে ধীরে চাপে পড়ে যাচ্ছে।

তবে সুসংবাদ হলো, লিভার এমন একটি অঙ্গ যা নিজের ক্ষতি অনেকটাই মেরামত করতে পারে যদি আমরা তাকে সুযোগ দিই। আর সেই সুযোগ কোনো “ডিটক্স চা” নয়; বরং সাধারণ, ধারাবাহিক কিছু অভ্যাস।

পর্যাপ্ত পানি পান করা, শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত চিনি ও ট্রান্স ফ্যাট কমানো, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ না খাওয়া এই সাধারণ কাজগুলোই লিভারের জন্য সবচেয়ে বড় সহায়তা।

মজার ব্যাপার হলো, যেসব কাজকে আমরা খুব সাধারণ মনে করি, সেগুলোই বিজ্ঞাপনের “মিরাকল ডিটক্স” থেকে অনেক বেশি কার্যকর। কারণ শরীরকে সুস্থ রাখার বিজ্ঞান এখনো শর্টকাট শেখায়নি।

লিভারকে ভালো রাখতে হলে শরীরকে শাস্তি দিয়ে নয়, বরং যত্ন দিয়ে চলতে হবে।কারণ শরীর কোনো ময়লার ঝুড়ি নয়, আর লিভারও কোনো একদিনে “পরিষ্কার” করার জিনিস নয়। এটি প্রতিদিনের জীবনের প্রতিফলন।

হয়তো তাই, সবচেয়ে কার্যকর “লিভার ডিটক্স” কোনো বোতলে বিক্রি হয় না।সেটি লুকিয়ে থাকে আমাদের প্রতিদিনের খাবার, ঘুম, হাঁটা আর ছোট ছোট সচেতন সিদ্ধান্তের ভেতর।

লেখক- ফাহিমা হোসেন মুনা। রিসার্চ টিম হেড,বাংলাদেশ ইকোনমিক সোসাইটি নিউট্রিশন ইন্টার্ন, ইবনে সিনা হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিষয়ক কনটেন্ট বিশেষজ্ঞ; প্রতিষ্ঠাতা, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাথওয়েজ

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

নামাজের সময়সূচি

ওয়াক্ত সময়সূচি
ফজর ৩:৫৫ - ৫:১৩ ভোর
যোহর ১১:৫৫ - ৪:২২ দুপুর
আছর ৪:৩২ - ৬:২৭ বিকেল
মাগরিব ৬:৩২ - ৭:৫০ সন্ধ্যা
এশা ৭:৫৫ - ৩:৫০ রাত

মঙ্গলবার ১২ মে ২০২৬