বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিকল্পনা এবং ওয়াশিংটনের ‘কাণ্ডজ্ঞানহীন’ পারমাণবিক নীতির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে চীন ও রাশিয়া। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বেইজিংয়ে ট্রাম্পকে জমকালো অভ্যর্থনা দেওয়ার ঠিক এক সপ্তাহ পর বুধবার পুতিনের সঙ্গে এক যৌথ শীর্ষ সম্মেলনে ওই ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে শি জিনপিংয়ের যৌথ বিবৃতিতে এই বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে, ট্রাম্পের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট স্থিতিশীল ও গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইলেও বৈশ্বিক কিছু স্পর্শকাতর ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার মৌলিক মতপার্থক্য রয়েছে; যেখানে চীনের অবস্থান রাশিয়ার সঙ্গে সম্পূর্ণ এক।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভূমি ও মহাকাশ-ভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার বিষয়ে ট্রাম্পের যে পরিকল্পনা, তা বৈশ্বিক কৌশলগত স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে। একই সঙ্গে এতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের মজুত সীমিত রাখার চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়েও ওয়াশিংটনের সমালোচনা করা হয়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এরপর মস্কোর পক্ষ থেকে চুক্তির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হলেও ট্রাম্প তাতে কোনও সাড়া দেননি। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রাজনীতিক বলেছিলেন, চীনের পরমাণু অস্ত্র মোকাবিলা করার জন্য নিজেদের অস্ত্রের মজুত আরও বাড়ানো উচিত ওয়াশিংটনের। যদিও চীন বলেছে, তাদের অস্ত্র বৃদ্ধির এই হার মার্কিন মজুতের তুলনায় অনেক কম।
বৈশ্বিক নিরাপত্তা ইস্যুতে দুই নেতা এক সুরে কথা বললেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তারা বড় ধরনের কোনও চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছেন; যা মস্কো দীর্ঘদিন ধরে পাওয়ার আশা করছিল। একটি নতুন পাইপলাইন নির্মাণের বিষয়ে ওই চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা ছিল মস্কো-বেইজিংয়ের; যার মাধ্যমে রাশিয়ায় উৎপাদিত প্রাকৃতিক গ্যাস চীনে রপ্তানির পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি করা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হয়।
• একের পর এক শীর্ষ সম্মেলন শি জিনপিংয়ের
এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে শি জিনপিং কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক সপ্তাহ পার করলেন। চীনের সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী এবং অন্যতম ঘনিষ্ঠ অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া—উভয় দেশের শীর্ষ নেতার সঙ্গেই বৈঠক করেছেন তিনি।
ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন এবং পুতিনের বাহিনী ইউক্রেন যুদ্ধে অনেকাংশেই আটকে রয়েছে। এমন সময়ে এসব শীর্ষ সম্মেলন চীনের নেতাকে বিশ্বমঞ্চে বেইজিংকে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার স্তম্ভ এবং একটি অপরিহার্য কূটনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ করে দিয়েছে।
ট্রাম্পের সঙ্গে শীর্ষ সম্মেলন যেখানে মূলত পারস্পরিক উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে পুতিনের সঙ্গে এই সাক্ষাৎ এক ভিন্ন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিল। উভয় পক্ষ আগেই যে সম্পর্ককে ‘সীমাহীন’ বলে ঘোষণা করেছে, সেই সম্পর্কে নতুন করে আরও কতটা অগ্রগতি হলো, তা প্রমাণ করাটা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।
শি জিনপিং ও পুতিন এ পর্যন্ত ৪০ বারেরও বেশি সময় মুখোমুখি বৈঠক করেছেন। উভয়েই রাশিয়া-চীন সম্পর্কের গভীরতার ওপর জোর দিয়েছেন; যা ২০২২ সালে একটি কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে আরও সুদৃঢ় হয়েছিল। চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার তিন সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করেছিল মস্কো।
পুতিনের এই সফরের আগেই মস্কো ইঙ্গিত দিয়েছিল, তারা চীনের সঙ্গে নতুন জ্বালানি চুক্তি করতে আগ্রহী। চীন বর্তমানে রুশ তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা এবং রাশিয়া পাইপলাইন ও সমুদ্রপথ উভয় মাধ্যমেই তেল সরবরাহ আরও বাড়াতে চায়।
রাশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক বলেছেন, রাশিয়ার কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদে তেল নিতে আগ্রহী চীন এবং তারা আমদানির পরিমাণ আরও বাড়াতে চায়। তিনি বলেন, গত চার মাসে এই আমদানির পরিমাণ প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে।
• অধরাই থেকে গেল গ্যাস চুক্তি
গত বছরের সেপ্টেম্বরে পুতিনের সর্বশেষ সফরের সময় রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস জায়ান্ট গ্যাজপ্রম বলেছিল, পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২ প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে দুই পক্ষই একমত হয়েছে। ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটার (১ হাজার ৬১৬ মাইল) দীর্ঘ এই প্রস্তাবিত পাইপলাইনের মাধ্যমে মঙ্গোলিয়া হয়ে প্রতি বছর রাশিয়া থেকে চীনে ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার (বিসিএম) গ্যাস সরবরাহ করার কথা রয়েছে।
চীন অবশ্য এই প্রকল্প নিয়ে প্রকাশ্যে খুব কমই কথা বলেছে। বুধবার শি জিনপিং বলেছেন, জ্বালানি ও সম্পদ সংযোগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা চীন-রাশিয়া সম্পর্কের ‘মূল ভিত্তি’ হওয়া উচিত। তবে তিনি এই পাইপলাইনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কোনও কিছুই জানাননি।
গ্যাসের মূল্য নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই আলোচনা চূড়ান্ত রূপ নিতে আরও কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
ক্রেমলিন বলেছে, প্রকল্পের প্রধান প্রধান বিষয়ের ওপর উভয় পক্ষ একটি ‘সাধারণ বোঝাপড়ায়’ পৌঁছেছে। যদিও কোনও সুনির্দিষ্ট বিবরণ বা চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। অন্যদিকে নোভাক বলেছেন, রাশিয়া ও চীন পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের চুক্তিগুলো চূড়ান্ত করার পর্যায়ে রয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স।