বৃহঃস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
ফাইল ছবি
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির কেন্দ্রস্থলে সোমবার সারাদিন ছিল অস্থিরতা। কনট প্লেস, জনপথ বা যন্তর মন্তর—সব জায়গাতেই হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর ভিড় ও জমায়েত চোখে পড়ছিল। এমনকি অনেক জায়গায় মেট্রো স্টেশন ও রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার পরও তারা সকাল থেকে সব ধরনের বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে যন্তর মন্তরে পৌঁছনোর চেষ্টা করছিলেন। লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস প্রযোগেও তাদের সরানো যায়নি।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অবস্থান শুরু করেন।
সাড়ে তিন ঘণ্টা পর পুলিশ তাদের জোর করে সরিয়ে দেয়। বাস বোঝাই করে নেতাদের নিয়ে যাওয়া হয়। জবরদস্তি করে নিয়ে যাওয়ার সময় রাহুল গান্ধীর নাক দিয়ে রক্ত পড়তে দেখা যায়। এর দুই ঘণ্টা পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রতিবাদে এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে দেশের ছাত্রসমাজ গত সোমবার সংসদ ভবন অভিমুখে গেলে দিল্লি পুলিশ তাদের বেধড়ক লাঠিপেটা করে ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে।
এর প্রতিবাদে ও আলোচনার দাবিতে গতকাল রাহুলসহ বিরোধী নেতারা স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু কোনো আশ্বাস না পাওয়ায় বিকেলে আচমকা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে তারা ধরনায় (অবস্থান কর্মসূচি) বসেন।
রাহুল পরপর কয়েকটি বার্তা দেন ‘এক্স’ হ্যান্ডলে। একটিতে বলেন, ‘পুলিশি অত্যাচারের জবাব চাইতে এসেছি। এই সরকার কোনো দায় নিতে চায় না। সংসদে আলোচনা চায় না। দেশের যুব সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার অপরাধে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত।’
অন্য এক বার্তায় রাহুল বলেন, ছাত্রদের ওপর আক্রমণ প্রতিটি ভারতীয় পরিবারকে আক্রমণের শামিল। প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, কোনো জবাবদিহি না করে পার পেয়ে যাবেন। এবার তা হবে না। ওই বার্তায় দেশপ্রেমিক প্রতিটি পরিবারকে ধরনায় শামিল হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে রাহুল বলেন, ছাত্রদের আওয়াজ বিফলে যাবে না।
রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গতকাল সংসদ ভবন থেকে যান রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে পুলিশের হামলায় আহত ছাত্রছাত্রীদের দেখতে। সেখান থেকে ফিরে তারা খাড়গের বাড়ি যান। সেখানেই ঠিক হয়, তারা সদলে ৭ লোক কল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের সামনে ধরনায় বসবেন। সেই অনুযায়ী বেলা সাড়ে তিনটায় তারা অবস্থান শুরু করেন পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীদের হকচকিত করে। কিছু সময়ের মধ্যে কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে দেখা করতে যান প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং। তার সঙ্গে ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন। রাহুলের সঙ্গে জিতেন্দ্র সিংকে কিছুক্ষণ কথা বলতেও দেখা যায়। এরপর তারা চলে যান।
আরও পড়ুন: ইরানের যেসব লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
ইতিমধ্যে ধরনায় ভিড় বাড়তে থাকে। কেরলম ও কর্ণাটকের দুই কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী যথাক্রমে ভি ডি সতীশন এবং ডি কে শিবকুমার, কে সি বেনুগোপাল, এনসিপি নেত্রী সুপ্রিয়া সুলে, সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব, আন্দোলনকর্মী যোগেন্দ্র যাদবসহ অনেকেই ধরনাস্থলে চলে আসেন। কংগ্রেসের নেতা–কর্মীরা সরকারবিরোধী স্লোগান দিতে থাকেন।
সন্ধ্যা ছয়টার দিকে জিতেন্দ্র সিং গণমাধ্যমকে জানান, রাহুল গান্ধীর দাবি ছিল সংসদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে হবে। সরকার তা মেনে নিয়েছে। তাকে বলা হয়, সরকার আজ বুধবারেই আলোচনায় প্রস্তুত। কিন্তু তারপর রাহুল মন বদলান। তিনি বলেন, শুধু আলোচনা নয়, শিক্ষামন্ত্রীকেও পদত্যাগ করতে হবে।
সরকার শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি মানতে রাজি হয়নি। এরপরই ঠিক হয়, জোর করে তাদের সরিয়ে দেওয়া হবে। দিল্লি পুলিশ সেটাই করে। সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাহুল, প্রিয়াঙ্কাসহ সব নেতাকে জবরদস্তি করে বাসে তুলে নিয়ে যাওয়া শুরু হয়। রাহুলকে মাটিতে শুয়ে পড়তে দেখা যায়।
১০–১২ জন পুলিশ তাকে জবরদস্তি করে উঠিয়ে বাসে তোলেন। ধস্তাধস্তির সময় রাহুলের নাক দিয়ে রক্ত পড়তে দেখা যায়। পরে রাহুল গান্ধীসহ আটক নেতাদের একটি দলকে বাসে করে দিল্লির ছত্রশাল স্টেডিয়ামে নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে রাহুল গান্ধী চলে যান।
আর প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ কয়েকজন নেতাকে নেওয়া হয় দিল্লির মন্দির মার্গ থানায়। ঘটনার পর কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি সোনিয়া গান্ধী ওই থানায় ছুটে যান। রাত ৯টা নাগাদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও মুক্তি পান।
ককরোচের আন্দোলন চলছে
ভারতে মেডিক্যাল ও ডেন্টালে ভর্তি পরীক্ষার (ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি–কাম–এনট্রান্স টেস্ট–নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাক্ষেত্রে নানা ধরনের দুর্নীতির প্রতিবাদে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) দুই মাস ধরে আন্দোলন করছে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে প্রথমে দিল্লি, তারপর দেশের নানা শহরে তারা বিক্ষোভ দেখিয়েছে। প্রায় এক মাস আগে তারা দিল্লিতে নতুন করে ধরনা কর্মসূচি নেয়।
২৪ দিন আগে সে অবস্থান আন্দোলন শুরু করলে লাদাখের শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ম্যাগসাইসাই পুরস্কারপ্রাপ্ত সোনম ওয়াংচুক ছাত্রদের সমর্থনে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন শুরু করেন।
২০ জুলাই শুরু হয় সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন। সিজেপি নেতারা আগেই জানিয়েছিলেন, শুরুর দিনেই তারা সংসদ ভবনে অভিযান করবেন। তার ঠিক দুই দিন আগে দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের অবস্থান মঞ্চ থেকে জোর করে তুলে নিয়ে যায় সোনম ওয়াংচুককে। ভর্তি করা হয় হাসপাতালে।