বুধবার, ৩ জুন ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার সরকারের পতন ছিল ছাত্র-জনতার জাতীয় পর্যায়ের অর্জন। এবার বিশ্ব দরবারে বড় অর্জন বয়ে আনলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের ৮১তম সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২ জুন) যুক্তরাষ্ট্রের সময় সকাল ১০টায় দেশটির নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দফতরের অ্যাসেম্বলি হলে সাধারণ অধিবেশনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়। নির্বাচনে ভোট দেয় জাতিসংঘের ১৯০টি সদস্যরাষ্ট্র।
এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে ৯৯টি দেশের ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন ড. খলিলুর রহমান। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাইপ্রাসের বহুপক্ষীয় কূটনীতি বিষয়ক বিশেষ দূত ও রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেজ কাকাউরিস। তিনি পেয়েছেন ৯১টি দেশের ভোট।
অর্থাৎ, হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে জিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন ড. খলিলুর রহমান। তিনি দ্বিতীয় বাংলাদেশি, যিনি জাতিসংঘের মতো একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার ছয়টি শাখার অন্যতম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হলেন।
এর আগে ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ থেকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। চার দশক পর ফের বাংলাদেশকে সেই সাফল্য এনে দিলেন বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
এই বিজয় বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি বলে একটি টেভি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পরিষদের বর্তমান সভাপতি এবং জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবকের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন তিনি। দায়িত্ব পালন করবেন আগামী এক বছর।
এদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় ড. খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বলেছেন, ‘এ অর্জন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অবদান ও গ্রহণযোগ্যতার প্রতিফলন।’
প্রধানমন্ত্রী আশাপ্রকাশ করেছেন, ড. খলিলুর রহমান ভবিষ্যতে গর্বের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং বহুপাক্ষিক ইস্যুতে সংযোগ, সংলাপ ও সহযোগিতা জোরদারে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন। নতুন এই দায়িত্ব পালনে তার প্রতি শুভকামনাও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রসঙ্গত, এমন এক প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের ভোট অনুষ্ঠিত হলো, যখন বিশ্বজুড়ে একাধিক সংঘাত, ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক বিভাজন, জাতিসংঘের আর্থিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন জোরালো হয়েছে।
একইসঙ্গে জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ আগামী বছর শেষ হতে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক সংস্থাটির পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচন প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। ফলে সাধারণ পরিষদের ৮১তম নির্বাচনে বাংলাদেশের বিজয়কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
খলিলুর রহমানের জেতার সম্ভাবনা নিয়ে সরকারের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বলেছিলেন, ‘আমাদের সমস্যা একটাই— আমরা প্রচারণার জন্য মাত্র তিন মাস সময় পেয়েছি। অন্যদিকে, সাইপ্রাস বিগত ১০ বছর ধরে এই পদের জন্য চেষ্টা করছে। তবে ভোটের ফলাফল নির্ধারিত হতে পারে আরএসএ-এর ওপর। আরএসএ এক ধরনের নৈতিক দায়বদ্ধতা। আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের একটি ‘ক্লিন ইমেজ’ বা ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে, যার প্রভাব ভোটে পড়বে বলে আমরা আশাবাদী।’
সরকারের আরেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বলেছিলেন, ‘আমাদের প্রার্থী (খলিলুর রহমান) অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি চমৎকার। গ্লোবাল সাউথ-এর সমর্থন, মুসলিম ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভোট, শান্তিরক্ষা ও জলবায়ু কূটনীতিতে ইতিবাচক ভাবমূর্তির কারণে বৃহৎ উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। সবকিছুর ইতিবাচক প্রভাব ভোটে পড়তে পারে।’
শেষমেশ সেটাই সত্যি হলো। জাতিসংঘের মতো একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সাধারণ পরিষদের নির্বাচনে জিতে শেষ হাসিটা বাংলাদেশ এবং খলিলুর রহমানই হাসলেন।
যেভাবে প্রার্থী হলেন খলিলুর রহমান
২০২০ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন এই পদে নির্বাচনের আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং ২০২৬ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ থেকে বাংলাদেশের প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি জাতিসংঘকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। পরবর্তীতে অন্তর্র্বতী সরকারের সময় সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনকে মনোনীত করা হয়েছিল। তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশ ও সাইপ্রাস ছাড়াও ফিলিস্তিনের প্রতিনিধি থাকায় ঢাকা তখন কিছুটা ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করে।
এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। এরপর টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয় খলিলুর রহমানকে, যিনি সাবেক অন্তর্র্বতী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রার্থী পরিবর্তন করে খলিলুর রহমানকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয় এবং তৌহিদ হোসেন বাদ পড়েন। এর মধ্যে ফিলিস্তিনও নির্বাচন থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ায় শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় বাংলাদেশ ও সাইপ্রাসের মধ্যে।
খলিলুর রহমানের নির্বাচনি ভিশন যা ছিল
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ নির্বাচনে বাংলোদেশের প্রার্থী হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচনি ভিশন বিবৃতিতে ছয়টি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র তুলে ধরা হয়েছিল। যার মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ, সকল দেশকে সমান অধিকারের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া এবং বিশ্বব্যাপী মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া।
ড. খলিলুর রহমান নির্বাচিত হলে তিনি সবার জন্য পূর্ণকালীন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বলেন, গ্লোবাল সাউথের একজন প্রার্থী হিসেবে তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর আকাঙ্ক্ষা বহন করলেও নির্বাচিত হলে সমগ্র সদস্যপদের স্বার্থে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবেন।
তার মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, মহামারি প্রস্তুতি, উন্নয়নের অধিকার এবং পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের মতো বিষয়গুলো আগামী অধিবেশনে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের সম্মিলিত সংকল্পের পরীক্ষা নেবে।
খলিলুর রহমান প্রতিশ্রুতি দেন, নির্বাচিত হলে আস্থা পুনর্গঠন, ঐকমত্য গড়ে তোলা এবং সদিচ্ছাপূর্ণ আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে বহুপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারে কাজ করবেন। অবশেষে তিনি বিজয়ী হলেন। এবার ভোটের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পালা।