শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩


পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

‘এভিয়েশন হাব গড়তে দেশীয় এয়ারলাইনসকে শক্তিশালী করতে হবে’

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:৪৫

ছবি ‍: সংগৃহীত

ছবি ‍: সংগৃহীত

শুধু বড় বিমানবন্দর ও আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণ করলেই বাংলাদেশকে এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এজন্য আগে দেশীয় এয়ারলাইনগুলোকে সক্ষম করে তুলতে হবে এবং তাদের পরিচালন ব্যয় কমিয়ে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি ও বিমান চলাচল খাতে নীতিগত সংস্কার জরুরি।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টারে বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ শীর্ষক সম্মেলনে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন এসব কথা বলেন।

ইউএস-বাংলার এমডি বলেন, শুধু এভিয়েশন হাব বললেই বাংলাদেশ এভিয়েশন হাব হয়ে যাবে না। এ ক্ষেত্রে দেশীয় এয়ারলাইনগুলোকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে। বিদেশি এয়ারলাইন এ ভূমিকা পালন করবে না। তাই দেশীয় এয়ারলাইনকে সক্ষম করে তোলার পাশাপাশি তাদের ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ সহজ করতে হবে।

ঢাকার তৃতীয় টার্মিনালের প্রসঙ্গ তুলে আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, টার্মিনাল নির্মাণের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এয়ারলাইন অপারেটরদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরামর্শ করা হয়নি। অথচ একটি আন্তর্জাতিক টার্মিনাল মূলত এয়ারলাইন অপারেটর ও যাত্রীদের প্রয়োজন বিবেচনায় রেখেই নির্মাণের কথা।

তিনি জানান, তিনি নিজে এবং অন্যান্য এয়ারলাইন অপারেটররাও তৃতীয় টার্মিনালে কী ধরনের সুবিধা প্রয়োজন, সে বিষয়ে মতামত দেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ পাননি।

এভিয়েশন হাব হিসেবে সিঙ্গাপুরের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে টার্মিনালগুলোতে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অবস্থানের উপযোগী কেনাকাটা, বিনোদন ও অন্যান্য সুবিধা রয়েছে। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও বিনোদনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকলে শুধু বড় টার্মিনাল নির্মাণ করে এভিয়েশন হাব হওয়ার লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

বিমানবন্দরে রানওয়ের সংকটের কারণে এয়ারলাইনগুলোর অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়ের বিষয়টিও তুলে ধরেন ইউএস-বাংলার এমডি। তিনি বলেন, রানওয়ের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে একটি বোয়িং উড়োজাহাজে প্রায় ৩০০ কেজি অতিরিক্ত জ্বালানি পুড়ে। এয়ারবাসের ক্ষেত্রে এ পরিমাণ প্রায় ৯০০ কেজি। ছোট উড়োজাহাজের ক্ষেত্রেও প্রায় ৭৫ কেজি পর্যন্ত অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হয়।

ইউএস-বাংলার ক্ষেত্রে শুধু একটি রানওয়ের কারণে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ টাকা ক্ষতি হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তার মতে, অবতরণ ও উড্ডয়নের সময় উড়োজাহাজকে একাধিক সারিতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের পাশাপাশি ফ্লাইট সময়মতো পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়ছে এবং যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছে।

বাংলাদেশের বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে একাধিক প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, ঢাকা-কলকাতা রুটে একাধিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কোম্পানি কাজ করছে। কুয়ালালামপুরেও একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অথচ বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থাকে সুরক্ষার যুক্তিতে প্রতিযোগিতা সীমিত রাখা হয়েছে। এতে সেবার মান ও আকাশপথে যোগাযোগ—দুই ক্ষেত্রেই ক্ষতি হচ্ছে।

তিনি জানান, ইউএস-বাংলা ২০২৩ সালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সনদ পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির এ কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক মানের সনদ থাকলেও প্রয়োজনীয় লাইসেন্স না থাকায় এখনো গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সুযোগ পাচ্ছে না।

বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটে বিমানভাড়া তুলনামূলক বেশি হওয়ার পেছনে সরকারি কর ও শুল্ককে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন ইউএস-বাংলার এমডি। তিনি বলেন, ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুর যেতে একজন যাত্রীর কাছ থেকে সরকারি কর ও ভ্যাট বাবদ প্রায় ৯ হাজার ৮৯০ টাকা নেওয়া হয়। বিপরীতে কুয়ালালামপুর থেকে বাংলাদেশে আসার ক্ষেত্রে এ ধরনের খরচ প্রায় ২০০ টাকা।

ঢাকা-সিঙ্গাপুর রুটের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুর যাওয়ার সময় কর ও শুল্ক বাবদ প্রায় ৯ হাজার ৮৯০ টাকা দিতে হয়। বিপরীতে সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশে আসার সময় এ খাতে খরচ প্রায় ৫ হাজার ৮০০ টাকা। দুবাইসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক গন্তব্যেও একই ধরনের পার্থক্য রয়েছে বলে জানান তিনি।

অভ্যন্তরীণ রুটের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ঢাকা থেকে যশোর যেতে বিভিন্ন কর ও চার্জ মিলিয়ে একজন যাত্রীর ওপর প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা ব্যয় পড়ে। এ ছাড়া দেশের এয়ারলাইনগুলোর জন্য উড়োজাহাজের জ্বালানির দামও তুলনামূলক বেশি। টিকিট বিক্রিতে ৭ শতাংশ কমিশনের বিষয়টিও এয়ারলাইনগুলোর ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি করছে।

১৯৮৪ সালের বিধিমালার পরিবর্তে নতুন বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে এভিয়েশন খাতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। আন্তর্জাতিক মান ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুসরণ করে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রক কাঠামো আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।

ইউএস-বাংলা বাংলাদেশে একমাত্র আইএটিএ সদস্য এয়ারলাইন উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন নীতিমালার ফলে এয়ারলাইনগুলোর বড় ধরনের ব্যয় সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে।

উড়োজাহাজের ইঞ্জিন বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রেও সময় ও অর্থের অপচয় হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি বোয়িং উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের দাম প্রায় ৯ মিলিয়ন ডলার এবং নতুন ইঞ্জিনের দাম প্রায় ২৩ মিলিয়ন ডলার। ড্রিমলাইনারের একটি ইঞ্জিনের দাম ৫০ থেকে ৬০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। নতুন নীতির মাধ্যমে এ ধরনের ব্যয় কমানো সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

উড়োজাহাজ কেনার পরিবর্তে লিজিং ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেন ইউএস-বাংলার ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বলেন, বিশ্বের অধিকাংশ এয়ারলাইন লিজিং কোম্পানির কাছ থেকে উড়োজাহাজ নেয়। বড় অঙ্কের উড়োজাহাজের অর্ডারের ক্ষেত্রেও এসব প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক অর্থায়নের বড় অংশ বহন করে।

ইউএস-বাংলা আগামী কয়েক বছরে প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের উড়োজাহাজের অর্ডার দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে বলেও জানান তিনি। তবে এ অর্থ প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব নয়; উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারী ও লিজিং কোম্পানির অর্থায়নে উড়োজাহাজ নিয়ে ভাড়ার ভিত্তিতে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।

সম্মেলনে বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। বিশেষ অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক।

সম্মেলনে ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেন। এতে এভিয়েশন খাতসংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, উদ্যোক্তা এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সম্মেলনে গোল্ড স্পন্সর ছিল ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস।

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

নামাজের সময়সূচি

ওয়াক্ত সময়সূচি
ফজর ৪:২৭ - ৫:৩৮ ভোর
যোহর ১১:৫৫ - ৪:১৩ দুপুর
আছর ৪:২৩ - ৬:০১ বিকেল
মাগরিব ৬:০৬ - ৭:১৮ সন্ধ্যা
এশা ৭:২৩ - ৪:২২ রাত

শনিবার ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬