শনিবার, ৬ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩


ক্যানসার চিকিৎসা : ভয় নয়, প্রয়োজন আস্থা ও ন্যায়ভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:৬ জুন ২০২৬, ১২:১১

ছবি ‍: সংগৃহীত

ছবি ‍: সংগৃহীত

উনিশ বছরে বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলে আমাদের গ্রাম ক্যানসার কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার এবং ব্রেস্ট সেন্টারের কাজের অভিজ্ঞতায় আমরা প্রায় ৩০ হাজার নারীকে দেখেছি। এই সংখ্যার পেছনে শুধু রোগীর হিসাব নেই; আছে অগণিত কান্না, আতঙ্ক, অপমান, পরিবার ভাঙার গল্প, চিকিৎসা শুরু করার আগেই হাল ছেড়ে দেওয়ার বেদনা এবং কখনো কখনো অকারণভাবে বিদেশমুখী হওয়ার অসহায়তা।

আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, প্রাথমিক মূল্যায়ন, দ্বিতীয় মতামত বা চিকিৎসা পরিকল্পনার জন্য অনেক রোগী নিকটবর্তী দেশে চলে যান। এর একটি বড় কারণ হলো, নিজ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি আস্থার ঘাটতি। অথচ প্রতিটি রোগী যদি শুধু মূল্যায়ন বা দ্বিতীয় মতামতের জন্য গড়ে এক হাজার মার্কিন ডলার ব্যয় করেন, তবে হাজার হাজার রোগীর ক্ষেত্রে তা দেশের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের সমান।

আমাদের গ্রাম প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, স্থানীয় পর্যায়ে সঠিক পরীক্ষা, পরামর্শ ও চিকিৎসা-নির্দেশনা দিয়ে অন্তত ৫০ শতাংশ রোগীর বিদেশযাত্রা এড়ানো সম্ভব হয়েছে; এতে দেশের প্রায় ১৮৩ কোটি টাকার সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব হয়েছে। প্রশ্ন হলো, কেন মানুষ নিজের দেশের চিকিৎসার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছে না?

এর উত্তর শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসকের ঘরে নেই। উত্তর আছে আমাদের স্বাস্থ্য-সংস্কৃতি, যোগাযোগের ভাষা, রোগী ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসার ব্যয় এবং সামাজিক মানসিকতার মধ্যে।

আমরা অনেক সময় ক্যানসারকে এমনভাবে উপস্থাপন করি যেন এটি অবধারিত মৃত্যু, ভয়াবহ আর্থিক ধ্বংস এবং পরিবারের ওপর অভিশাপ। ‘ক্যানসার মানেই মৃত্যু’-এই ভয়ভিত্তিক ধারণা শুধু ভুল নয়, অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষতিকর। ক্যানসার বিপজ্জনক হতে পারে, কিন্তু সব ক্যানসার একই নয়; সব পর্যায়ও এক নয়; অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ, সঠিক চিকিৎসা পরিকল্পনা এবং নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে জীবন বাঁচানো যায়, ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। ভয় নয়, দরকার তথ্যভিত্তিক আস্থা।

আরেকটি গভীর সমস্যা হলো নারীর সামাজিক অবস্থান। পল ফার্মার ‘structural violence’ বা কাঠামোগত সহিংসতার কথা বলেছেন, যে সহিংসতা সরাসরি মারধর নয়, কিন্তু সমাজ, অর্থনীতি ও ক্ষমতার কাঠামো মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার কেড়ে নেয়।

আমাদের দেশে অনেক নারী নিজের শরীরের লক্ষণ বুঝলেও চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে পারেন না পরিবারের অনুমতি ছাড়া। কারণ তিনি অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল, চলাচলে নির্ভরশীল, সিদ্ধান্তে নির্ভরশীল। অনেক নারী ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর স্বামীর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হন, বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় অথবা দৈনন্দিন পারিবারিক জীবন থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। রোগের চেয়ে ভয়াবহ হয়ে ওঠে রোগীকে একা করে দেওয়ার সামাজিক নিষ্ঠুরতা।

এখানে সমাজের বড় দায় আছে। ক্যানসার কোনো পাপ নয়, কোনো লজ্জা নয়, কোনো অভিশাপ নয়। একজন ক্যানসার রোগীকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা, চিকিৎসা সিদ্ধান্ত থেকে দূরে রাখা বা তাকে অর্থনৈতিক বোঝা হিসেবে দেখা, এসব শুধু অমানবিক নয়, জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিতেও ক্ষতিকর।

চিকিৎসা ব্যয়ের ক্ষেত্রেও আমাদের বাস্তব সমস্যা আছে। অনেক সময় প্রাথমিক রোগনির্ণয়ের খরচ খুব বেশি নয়; কিন্তু অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা, বারবার পরীক্ষা, অগোছালো রেফারেল এবং ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় দৌড়াদৌড়ির কারণে ব্যয় দ্রুত বেড়ে যায়। রোগী যখন চূড়ান্তভাবে চিকিৎসা শুরু করতে চান, তখন পরিবারের আর্থিক শক্তি অনেকটাই শেষ হয়ে যায়। ফলে চিকিৎসা শুরু হয় দেরিতে বা মাঝপথে থেমে যায়।

সরকার ক্যানসার চিকিৎসায় বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে, এটা প্রশংসনীয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রয়োজনের তুলনায় অবকাঠামো এখনো অত্যন্ত সীমিত। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক বাংলাদেশে রেডিয়েশন থেরাপির জন্য অন্তত ১৮০টি লিনিয়ার অ্যাকসেলারেটর প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেন, যেখানে দেশে কার্যকর মেশিনের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।

অন্যদিকে, বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে ক্যানসার চিকিৎসা সেবা ঢাকাকেন্দ্রিক এবং বিশেষায়িত সেবা জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে যথেষ্ট বিস্তৃত হয়নি।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বাস্তবতার একটি হলো খুলনা বিভাগ। প্রায় দুই কোটি মানুষের এই বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে একটি পূর্ণাঙ্গ রেডিওথেরাপি সুবিধা নেই। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, নড়াইল, মাগুরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরের মানুষকে ক্যানসার চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশের জন্য ঢাকায় বা অন্যত্র যেতে হয়। রোগীর জন্য এটি শুধু ভ্রমণ নয়; এটি সময়, অর্থ, মানসিক চাপ, কর্মহানি এবং অনেক সময় চিকিৎসা বিলম্বের কারণ।

আসন্ন জাতীয় বাজেটে তাই ক্যানসার চিকিৎসাকে শুধু হাসপাতাল নির্মাণের বিষয় হিসেবে দেখা যাবে না। একে দেখতে হবে স্বাস্থ্য-ন্যায়, আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং দরিদ্র ও গ্রামীণ মানুষের চিকিৎসা-অধিকারের প্রশ্ন হিসেবে।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৬৭ শতাংশ মানুষ গ্রামীণ এলাকায় বাস করে। অথচ উন্নত চিকিৎসা সুবিধার বড় অংশ এখনো নগরকেন্দ্রিক। প্রশ্ন উঠতেই পারে, যেখানে মানুষ গ্রামে, সেখানে সেবা কেন শুধু শহরে?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ওষুধের মূল্য। হৃদরোগের স্টেন্ট বা হার্টের রিং-এর ক্ষেত্রে সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নিয়ে ব্যয় কমানোর দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। ক্যানসার ওষুধের ক্ষেত্রেও বাজার পর্যবেক্ষণ, দর-কষাকষি, জেনেরিক ওষুধের মান নিশ্চিতকরণ এবং সরকারি ক্রয়ক্ষমতা ব্যবহার করে মূল্য কমানো জরুরি।

বৈশ্বিক ওষুধবাজারে বহুজাতিক কোম্পানির প্রভাব শক্তিশালী এটি সত্য। কিন্তু তাই বলে বাংলাদেশ তার দরিদ্র ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর পক্ষে নীতিগত অবস্থান নেবে না, এটি হতে পারে না।

এখানে আরও একটি নীতিগত প্রশ্ন আছে। দেশে গ্রামীণ পর্যায়ে যে প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিকার অর্থে স্বাস্থ্যসেবা, রোগী শনাক্তকরণ, রেফারেল, ফলোআপ ও গবেষণার কাজ করছে, তাদের অনেক সময় লাইসেন্সিং ও প্রশাসনিক জটিলতায় দীর্ঘসূত্রিতার জালে আটকে দেওয়া হয়।

অবশ্যই মান নিয়ন্ত্রণ দরকার, কিন্তু মান নিয়ন্ত্রণের নামে সেবা বন্ধ করা উচিত নয়। জেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জন অফিসকে আরও কার্যকর মনিটরিং কর্তৃত্ব ও সহযোগিতামূলক ভূমিকা দেওয়া যেতে পারে, যাতে গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো নিয়ম মেনে কাজ করতে পারে এবং রোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত না হন।

ক্যানসার মোকাবিলা কোনো একক হাসপাতাল, একক মন্ত্রণালয় বা একক চিকিৎসকের কাজ নয়। এটি একটি সম্মিলিত জাতীয় দায়িত্ব। এখানে দরকার, সরকারি বিনিয়োগ, বেসরকারি ও অলাভজনক উদ্যোগের স্বীকৃতি, কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা, নারীর চিকিৎসা সিদ্ধান্তে স্বাধীনতা, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার নিয়ন্ত্রণ, সুলভ ওষুধ, আঞ্চলিক রেডিওথেরাপি সেবা এবং রোগীর প্রতি মানবিক আচরণ।

আমাদের ক্যানসার-বার্তা বদলাতে হবে। ভয় দেখিয়ে নয়, আস্থা দিয়ে। রোগীকে একা করে নয়, পাশে দাঁড়িয়ে। শহরকেন্দ্রিক সেবা নয়, গ্রামীণ মানুষের দরজায় সেবা পৌঁছে দিয়ে।

ক্যানসার চিকিৎসা শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রশ্ন নয়; এটি মানবিকতা, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। যে নারী আজ পরিবারের অনুমতির অপেক্ষায় চিকিৎসা নিতে দেরি করছেন, যে মা রোগ নির্ণয়ের পর বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, যে কৃষক স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য জমি বিক্রি করছেন, যে তরুণী ভুল ধারণার কারণে পরীক্ষা করাতে ভয় পাচ্ছেন, তাদের সবার জন্য আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবতে হবে।

বাংলাদেশ যদি সত্যিই অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের দেশ হতে চায়, তবে ক্যানসার চিকিৎসাকে ঢাকার গণ্ডি থেকে বের করে মানুষের কাছে নিতে হবে। খুলনা বিভাগসহ প্রতিটি অঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার সেবা, বিশেষ করে রেডিওথেরাপি, দ্রুত প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আসন্ন বাজেটেই এ বিষয়ে জরুরি অগ্রাধিকার ঘোষণা করা উচিত।

রেজা সেলিম : প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, আমাদের গ্রাম ক্যান্সার কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, রামপাল, বাগেরহাট

আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

নামাজের সময়সূচি

ওয়াক্ত সময়সূচি
ফজর ৩:৪৫ - ৫:০৬ ভোর
যোহর ১১:৫৬ - ৪:২৬ দুপুর
আছর ৪:৩৬ - ৬:৩৭ বিকেল
মাগরিব ৬:৪২ - ৮:০৩ সন্ধ্যা
এশা ৮:০৮ - ৩:৪০ রাত

শনিবার ৬ জুন ২০২৬