মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
বর্ষাকালে ঢাকাবাসীর কাছে বৃষ্টি অনেক সময় আশীর্বাদ নয়, বরং আতঙ্কের আরেক নাম। এক ঘণ্টার প্রবল বর্ষণেই রাজধানীর বহু সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যায়, যানজট স্থবির হয়ে পড়ে, ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হয় এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
প্রতি বছর একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে, এত প্রকল্প, এত অর্থ বরাদ্দ এবং এত পরিকল্পনার পরও কেন ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হচ্ছে না?
সম্প্রতি এক বর্ষার সকালে মিরপুরের একটি সড়কে হাঁটু সমান পানি জমে যায়। অফিসগামী মানুষকে জুতা হাতে নিয়ে হেঁটে যেতে দেখা যায়। অন্যদিকে পুরান ঢাকার সূত্রাপুর, যাত্রাবাড়ী কিংবা মান্ডা এলাকায় বৃষ্টির পানি ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে। নগরবাসীর এই দুর্ভোগ যেন ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
তবে এবার আশার কিছু আলোও দেখা যাচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য ১০ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বরাদ্দের একটি বড় অংশ জলাবদ্ধতা নিরসন, ড্রেনেজ উন্নয়ন, নদী ও খাল পুনরুদ্ধার এবং বন্যা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
যদিও এখনো প্রকল্পভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ বরাদ্দ তালিকা প্রকাশিত হয়নি, তবুও সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে, তা স্পষ্ট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা শুধুমাত্র ড্রেন পরিষ্কারের সমস্যা নয়। বরং এটি দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল দখল, জলাধার ভরাট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার ফল।
এক সময় ঢাকার চারপাশে অসংখ্য খাল, বিল ও জলাভূমি ছিল, যা অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণ ও নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রাকৃতিক জলাধারের বড় অংশ হারিয়ে গেছে।
সরকার ইতিমধ্যে ঢাকার ১৪১টি জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ১০৮টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ৩৩টি স্পট রয়েছে। এসব এলাকাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়নের আওতায় আনা হচ্ছে। ড্রেন সংস্কার, খাল পুনঃখনন, কালভার্ট মেরামত এবং পাম্পিং সুবিধা বৃদ্ধির কাজ চলমান রয়েছে।
বর্তমানে ঢাকায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। এর মধ্যে রয়েছে খাল পুনরুদ্ধার ও উন্নয়ন প্রকল্প, বক্স কালভার্ট অপসারণ কর্মসূচি, সমন্বিত ড্রেনেজ উন্নয়ন প্রকল্প এবং বিভিন্ন খালের পুনঃখনন কার্যক্রম। মান্ডা, জিরানি, শ্যামপুর, বেগুনবাড়ী ও কালুনগর খালের সংস্কারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ এসব খাল শহরের বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, খালের ওপর নির্মিত বক্স কালভার্ট পানি প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে বৃষ্টির সময় পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারে না। তাই বিভিন্ন এলাকায় পুরোনো বক্স কালভার্ট অপসারণ করে প্রাকৃতিক খাল পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে ঢাকার ড্রেনেজ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
তবে শুধু খাল পুনঃখনন করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কারণ শহরের অধিকাংশ ড্রেন ও খালে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কঠিন বর্জ্য জমা হচ্ছে। প্লাস্টিক, পলিথিন ও গৃহস্থালি আবর্জনা ড্রেনের মুখ বন্ধ করে দেয়। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি আটকে যায়। এজন্য বর্ষার আগে ব্যাপক ড্রেন পরিষ্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও সারা বছর কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতির খুব বেশি উন্নতি হবে না।
বিশ্বের উন্নত শহরগুলো জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় যে পদ্ধতি অনুসরণ করে, তা থেকে ঢাকার অনেক কিছু শেখার আছে। উদাহরণস্বরূপ, জাপানের টোকিও শহরে বিশাল ভূগর্ভস্থ জলাধার ও টানেল নির্মাণ করা হয়েছে। অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি সেখানে সাময়িকভাবে সংরক্ষণ করা হয় এবং পরে ধীরে ধীরে নদীতে ছেড়ে দেওয়া হয়। ফলে শহরে পানি জমে থাকার সুযোগ কমে যায়।
সিঙ্গাপুর আরেকটি সফল উদাহরণ। দেশটি বৃষ্টির পানিকে সমস্যা নয়, সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে। সেখানে রেইনওয়াটার হারভেস্টিং, কৃত্রিম জলাধার এবং উন্নত স্টর্মওয়াটার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও পুনঃব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে অত্যাধুনিক সেন্সর ও ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে কোথায় পানি জমছে, কোথায় নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তা রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
চীনের ‘স্পঞ্জ সিটি’ ধারণাও বর্তমানে বিশ্বব্যাপী আলোচিত। এই ব্যবস্থায় শহরের রাস্তা, পার্ক, ফুটপাত ও খোলা স্থানে পানি শোষণক্ষম উপকরণ ব্যবহার করা হয়। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত ড্রেনে না গিয়ে মাটিতে প্রবেশ করতে পারে। একই সঙ্গে গ্রিন রুফ, রেইন গার্ডেন এবং জল ধারণক্ষম সবুজ অবকাঠামো শহরের জলাবদ্ধতা কমাতে সাহায্য করে।
ঢাকার জন্যও এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা যেসব বিষয় গুরুত্বের সাথে দেখছেন,
প্রথমত, খাল ও জলাশয় সম্পূর্ণভাবে দখলমুক্ত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ড্রেনেজ নেটওয়ার্ককে আধুনিক ও সম্প্রসারিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, বড় আকারের রিটেনশন পন্ড ও রেইনওয়াটার রিজার্ভার নির্মাণ করতে হবে, যাতে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি সাময়িকভাবে সংরক্ষণ করা যায়।
চতুর্থত, নিচু এলাকায় নতুন পাম্পিং স্টেশন স্থাপন এবং বিদ্যমান পাম্পগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে একাধিক সংস্থা কাজ করছে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, রাজউক এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান। কিন্তু অনেক সময় সমন্বয়ের অভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয় কিংবা প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না। তাই একীভূত নগর ড্রেনেজ কর্তৃপক্ষ বা শক্তিশালী সমন্বয় কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন।
প্রশ্ন হলো, বর্তমান পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে সক্ষমতা কতটুকু বাড়বে? বাস্তব মূল্যায়নে বলা যায়, চলমান প্রকল্পগুলো সফলভাবে সম্পন্ন হলে স্বল্প ও মাঝারি মাত্রার বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে আসতে পারে।
বিশেষ করে চিহ্নিত ১৪১টি স্পটে পানি নিষ্কাশনের সময় কমবে এবং প্রধান সড়কগুলো দ্রুত সচল রাখা সম্ভব হবে। তবে অতি ভারী বর্ষণ বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট চরম আবহাওয়া পরিস্থিতিতে এখনো ঝুঁকি থেকে যাবে। অর্থাৎ শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং নাগরিক সচেতনতা, সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। ড্রেনে ময়লা ফেলা বন্ধ করা থেকে শুরু করে জলাভূমি সংরক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে বলা যায়, ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানের জন্য অর্থ বরাদ্দ অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেটা একমাত্র সমাধান নয়। খাল পুনরুদ্ধার, জলাধার সংরক্ষণ, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, স্মার্ট মনিটরিং প্রযুক্তি এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমন্বিত বাস্তবায়নই পারে রাজধানীকে জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে।
অন্যথায় প্রতি বর্ষায় নতুন বাজেট, নতুন প্রকল্প এবং নতুন প্রতিশ্রুতির মধ্যেও ঢাকাবাসীকে একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে। জলাবদ্ধতামুক্ত ঢাকা গড়তে এখন প্রয়োজন পরিকল্পনার চেয়ে বেশি, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি।
সমীরণ বিশ্বাস : কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ