বৃহঃস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ৩১ বৈশাখ ১৪৩৩
ফাইল ছবি
ক্ষমা, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তির এক অনন্য যাত্রার নাম হজ। বছরের পর বছর জমানো সঞ্চয় নিয়ে প্রিয়জনদের বিদায় জানিয়ে হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে আল্লাহর ঘরে হাজির হন মুমিনরা। হজ শুধু কোনো ভ্রমণ বা পর্যটন নয়, বরং ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের পঞ্চম ও আবশ্যিক একটি বিধান। সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জীবনে অন্তত একবার হজ করা ফরজ।
২০২৬ সালের হজ শুরু হতে আর দুই সপ্তাহেরও কম সময় বাকি। ২৫ মে সোমবার থেকে হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে ৩০ মে শনিবার পর্যন্ত চলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন ‘ইয়াওমে আরাফাহ’ বা আরাফা দিবস হতে পারে ২৬ মে মঙ্গলবার। পরদিন ২৭ মে বুধবার উদযাপিত হবে ঈদুল আজহা।
কার ওপর হজ ফরজ
ইসলামি বিধান অনুযায়ী, হজ সবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। শুধু প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী এবং শারীরিকভাবে সক্ষম মুসলিমদের ওপর হজ ফরজ। এর পাশাপাশি হজের খরচ মেটানোর মতো আর্থিক সচ্ছলতা এবং পরিবারের ভরণপোষণ নিশ্চিত করার সামর্থ্য থাকতে হবে। বৃদ্ধ, গুরুতর অসুস্থ বা আর্থিকভাবে অসচ্ছল ব্যক্তিদের ওপর হজ ফরজ নয়। এমনকি কোনো শিশু যদি হজে যায়, তবে সে সওয়াব পেলেও বড় হয়ে সামর্থ্য থাকলে তাকে পুনরায় হজ করতে হবে।
শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি
হজের সফরে প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ১৫ কিলোমিটার হাঁটতে হতে পারে। তীব্র রোদে মক্কা, মিনা, আরাফা ও মুজদালিফার মধ্যে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া বেশ কষ্টসাধ্য। তাই এখন থেকেই নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস করা এবং প্রচুর পানি ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া জরুরি। কোনো দীর্ঘমেয়াদী রোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় ওষুধ সাথে রাখা আবশ্যক।
ইহরাম
হজের ইহরাম শুধু একটি পোশাক নয়, এর মাধ্যমে হজের একটি বিশেষ মানসিক অবস্থা তুলে ধলা হয়। ইহরাম বাঁধার পর ঝগড়া-বিবাদ, উচ্চবাচ্য বা কোনো ধরনের অশোভন আচরণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পুরুষদের জন্য সেলাইবিহীন দুই টুকরো সাদা কাপড় এবং নারীদের জন্য পর্দার সাথে মুখ ও হাত খোলা রাখা যায় এমন পোশাকই হলো ইহরাম। এখানে ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা সবার পোশাক এক, যা মূলত আল্লাহর দরবারে মানুষের সমতার প্রতীক।
নিরাপত্তা ও সতর্কতা
লাখো মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া বা দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে সতর্ক থাকতে হবে। সবসময় নিজের পরিচয়পত্র সাথে রাখা, মোবাইল চার্জ রাখা এবং দলের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন না করা জরুরি। সৌদি কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলা এবং ভিড়ের মধ্যে মাস্ক ব্যবহার ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা স্বাস্থ্যের জন্য হিতকর।
একনজরে হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা
হজ শুরু হয় ইহরাম ও নিয়তের মাধ্যমে। এরপর মক্কায় পৌঁছে কাবা শরীফ সাতবার তওয়াফ এবং সাফা-মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার সায়ি করতে হয়। মিনার তাবুতে রাত কাটিয়ে হাজিরা উপস্থিত হন আরাফার ময়দানে। আরাফায় অবস্থানকে হজের মূল রোকন বলা হয়। সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেখানে কান্নাকাটি ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হয়।
আরাফা থেকে হাজিরা যান মুজদালিফায় এবং খোলা আকাশের নিচে রাত কাটান। সেখান থেকে শয়তানকে মারার জন্য কঙ্কর সংগ্রহ করা হয়। পরের দিনগুলোতে মিনায় জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ, দমে শোকর বা কোরবানি এবং মাথা মুণ্ডনের মাধ্যমে ইহরাম ত্যাগ করতে হয়। সবশেষে মক্কা ত্যাগের আগে বিদায়ী তওয়াফের মাধ্যমে শেষ হয় হজের আনুষ্ঠানিকতা।
মনে রাখা জরুরি
হজ ও ওমরাহ এক নয়। ওমরাহ বছরের যেকোনো সময় করা যায় এবং ওমরাহ একটি সংক্ষিপ্ত ইবাদত। কিন্তু হজ শুধু জিলহজ মাসের নির্দিষ্ট দিনগুলোতেই পালন করতে হয়। মনে রাখতে হবে, হজের উদ্দেশ্য যেন শুধু লোকদেখানো বা সামাজিক মর্যাদা না হয়; বরং তা যেন হয় একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। আরাফার দিন নিজের জন্য, পরিবারের জন্য এবং বিশ্ব মুসলিমের শান্তির জন্য দোয়া করতে ভুলে যাবেন না। এই দিনে করা দোয়া আল্লাহ ফিরিয়ে দেন না।