সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩


হরমোনের ভারসাম্য রক্ষায় সঠিক খাদ্যাভ্যাসের পূর্ণ গাইড

ফাহিমা হোসেন মুনা

প্রকাশিত:১১ মে ২০২৬, ২১:৩৫

ছবি ‍: সংগৃহীত

ছবি ‍: সংগৃহীত

পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম, যা সাধারণত পিসিওএস নামে পরিচিত, এটি একটি হরমোনজনিত সমস্যা যা বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ নারীকে প্রভাবিত করে। এই রোগে আক্রান্ত নারীদের শরীরে ইনসুলিন প্রতিরোধ, অতিরিক্ত অ্যান্ড্রোজেন হরমোন এবং অনিয়মিত মাসিক চক্রের মতো সমস্যা দেখা দেয়। তবে খুশির বিষয় হলো, সঠিক খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করলে পিসিওএসের লক্ষণগুলো অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। খাদ্য একটি ওষুধের মতো কাজ করে এবং প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় সামান্য পরিবর্তন এনে হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা করা, ইনসুলিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা এবং শরীরের প্রদাহ কমানো সম্ভব।

পিসিওএস এবং ইনসুলিনের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। গবেষণায় দেখা গেছে, পিসিওএসে আক্রান্ত প্রায় ৭০ শতাংশ নারী ইনসুলিন প্রতিরোধের শিকার। এর মানে হলো তাদের শরীরের কোষগুলো ইনসুলিনের প্রতি সঠিকভাবে সাড়া দেয় না, ফলে রক্তে ইনসুলিনের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং ডিম্বাশয় অতিরিক্ত অ্যান্ড্রোজেন তৈরি করতে শুরু করে। এই অ্যান্ড্রোজেনই মূলত মুখে অতিরিক্ত চুল গজানো, ত্বকে ব্রণ হওয়া, মাথার চুল পড়া এবং অনিয়মিত মাসিচক্রের জন্য দায়ী। তাই পিসিওএসের ডায়েটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ইনসুলিনের মাত্রা স্থিতিশীল রাখা।

কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত খাবার পিসিওএস ডায়েটের ভিত্তি। গ্লাইসেমিক ইনডেক্স হলো একটি মাপকাঠি যা বলে দেয় কোনো খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা কতটা দ্রুত বাড়ায়। সাদা ভাত, সাদা রুটি, চিনি এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়, যা ইনসুলিনের ঊর্ধ্বগতি ঘটায়। এর পরিবর্তে বাদামি চাল, লাল আটার রুটি, ওটস, মিষ্টি আলু এবং ডালজাতীয় খাবার বেছে নেওয়া উচিত। এই খাবারগুলো ধীরে ধীরে হজম হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখে।

প্রোটিন পিসিওএস ডায়েটের একটি অপরিহার্য অংশ। পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ করলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকে, অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমে এবং ইনসুলিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। ডিম, মাছ, মুরগির মাংস, ডাল, ছোলা, মসুর ডাল, পনির এবং দই প্রোটিনের চমৎকার উৎস। বিশেষ করে মাছ, যা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডে সমৃদ্ধ, পিসিওএসের প্রদাহ কমাতে বিশেষভাবে কার্যকর। ইলিশ, স্যামন, সার্ডিন এবং টুনা মাছ নিয়মিত খাওয়া উপকারী।

স্বাস্থ্যকর চর্বি বা ফ্যাট পিসিওএস ডায়েটে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। অনেকে মনে করেন চর্বি এড়িয়ে চললে স্বাস্থ্য ভালো থাকে, কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। অ্যাভোকাডো, বাদাম, আখরোট, অলিভ অয়েল, নারিকেল তেল এবং চিয়া বীজে থাকা স্বাস্থ্যকর চর্বি হরমোনের উৎপাদন ও ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে। তবে ট্রান্স ফ্যাট এবং অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবার, যেমন ভাজাপোড়া ও ফাস্ট ফুড থেকে দূরে থাকতে হবে।

শাকসবজি ও ফলমূল পিসিওএস ডায়েটে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। পালং শাক, ব্রকলি, বাঁধাকপি, ফুলকপি, গাজর এবং টমেটো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইবারে ভরপুর, যা শরীরের প্রদাহ কমায় এবং হজমশক্তি উন্নত করে। ফলের মধ্যে বেরি জাতীয় ফল যেমন স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি এবং রাস্পবেরি বিশেষভাবে উপকারী কারণ এগুলোর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বেশি। আম, কলা এবং আঙুরের মতো বেশি চিনিযুক্ত ফল পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত।

পিসিওএসে কিছু খাবার এড়িয়ে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিশোধিত চিনি, সফট ড্রিংক, প্যাকেটজাত জুস, কেক, পেস্ট্রি এবং চকলেট রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বাড়িয়ে দেয়। প্রক্রিয়াজাত খাবার যেমন চিপস, বিস্কিট এবং ইনস্ট্যান্ট নুডলসে ক্ষতিকর উপাদান থাকে যা হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। দুগ্ধজাত খাবারের ক্ষেত্রে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে পূর্ণচর্বিযুক্ত দুধ পিসিওএসের লক্ষণ বাড়াতে পারে, তাই কম চর্বির দই বা দুধ বেছে নেওয়া ভালো। অ্যালকোহল এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইনও হরমোনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

পানি পান করা পিসিওএস ব্যবস্থাপনার একটি সহজ কিন্তু কার্যকর উপায়। প্রতিদিন কমপক্ষে আট থেকে দশ গ্লাস পানি পান করলে শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের হয়ে যায়, ত্বক ভালো থাকে এবং বিপাকক্রিয়া সচল থাকে। গ্রিন টি একটি চমৎকার পানীয় যা ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতে এবং অ্যান্ড্রোজেনের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে বলে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে।

খাওয়ার সময় ও পরিমাণের উপরও বিশেষ মনোযোগ দেওয়া দরকার। একসাথে অনেক বেশি খাওয়ার বদলে দিনে পাঁচ থেকে ছয়বার অল্প অল্প করে খাওয়া উচিত। এতে রক্তে শর্করার মাত্রা সারাদিন স্থিতিশীল থাকে এবং ইনসুলিনের হঠাৎ ওঠানামা এড়ানো যায়। সকালের নাস্তা কখনো বাদ দেওয়া উচিত নয় কারণ এটি সারাদিনের বিপাকক্রিয়া নির্ধারণ করে।

পিসিওএস ডায়েট কোনো সাময়িক পরিকল্পনা নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী জীবনধারার পরিবর্তন। সঠিক খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ কমানো একসাথে কাজ করলে পিসিওএসের লক্ষণগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। একজন পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে নিজের শরীরের চাহিদা অনুযায়ী একটি ব্যক্তিগতকৃত ডায়েট পরিকল্পনা তৈরি করা সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।

স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখক, এন্টিঅক্সিডেন্ট পাথওয়েজ

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

নামাজের সময়সূচি

ওয়াক্ত সময়সূচি
ফজর ৩:৫৬ - ৫:১৩ ভোর
যোহর ১১:৫৫ - ৪:২২ দুপুর
আছর ৪:৩২ - ৬:২৬ বিকেল
মাগরিব ৬:৩১ - ৭:৪৯ সন্ধ্যা
এশা ৭:৫৪ - ৩:৫১ রাত

সোমবার ১১ মে ২০২৬