সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩
ছবি : সংগৃহীত
ঢাকার সাভারের আমিনবাজারে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলতাফ হোসেন (৫৮) হত্যাকাণ্ডকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছে র্যাব। এ ঘটনায় র্যাব-১০ ও র্যাব-৪ এর পৃথক অভিযানে এজাহারনামীয় আট আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র্যাব-১০ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান।
র্যাব জানায়, গত ৫ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টা থেকে ১১টার মধ্যে সাভারের আমিনবাজারের বরদেশী এলাকায় একটি প্রাইভেটকারের চালক ও তার সহযোগীদের হাতে এসআই আলতাফ হোসেন হত্যার শিকার হন। একটি অটো রিকশা রাখাকে কেন্দ্র করে গ্যারেজের মালিককে মারধরের প্রতিবাদ করায় তার সঙ্গে হামলাকারীদের বিরোধের সূত্রপাত হয়।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, গ্যারেজের মালিককে মারধরের সময় এসআই আলতাফ হোসেন প্রতিবাদ করেন। এ সময় হামলাকারীদের সঙ্গে তার ও ছেলে আরিফুলের বাগ্বিতণ্ডা হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে এসআই আলতাফ নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। এতে হামলাকারীরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
একপর্যায়ে প্রাণ বাঁচাতে এসআই আলতাফ তার ছেলের পোশাক কারখানায় আশ্রয় নেন। কিন্তু হামলাকারীরা সেখানেও গিয়ে আরও ১৫ থেকে ২০ জন সহযোগীকে ডেকে আনে। পরে কারখানার গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা দিয়ে এসআই আলতাফ ও তার ছেলে আরিফুলকে বেধড়ক মারধর করা হয়। একই সময় কারখানার মেশিন ও আসবাবপত্রও ভাঙচুর করা হয়।
পরে গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা বাবা-ছেলেকে উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক এসআই আলতাফ হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে সাভার মডেল থানায় ১৫ জনের নাম উল্লেখসহ আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার পর হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তারে র্যাব গোয়েন্দা নজরদারি শুরু করে।
র্যাব-১০ জানায়, এরই ধারাবাহিকতায় ৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মুন্সীগঞ্জ সদর থানাধীন লঞ্চঘাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে এজাহারনামীয় চার আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন- আলাউদ্দিন (২৬), আপন (৩০), জিহাদ (২০) ও ইমরান (২৬)। তাদের মধ্যে আপন সাভার থানার তিনটি মাদক মামলার আসামি।
অন্যদিকে, একই ঘটনায় র্যাব-৪ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সাভারের আমিনবাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও চার এজাহারনামীয় আসামিকে গ্রেপ্তার করে। তারা হলেন- নূর মোহাম্মদ রুদ্র (২৪), মো. রাকিব মিয়া (২৮), ছাব্বির আহমেদ (২৪) ও মো. ওয়াসিম (৪০)।
র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গ্রেপ্তারদের সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও আইনের আওতায় আনতে অভিযান চলমান রয়েছে।
আলতাফ হোসেনকে পুলিশ হিসেবে টার্গেট করে পিটিয়ে হত্যা করা হয়নি বলে জানায় র্যাব-১০ এর এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, এ ঘটনায় এজাহারভুক্ত ১৫ আসামির মধ্যে অধিকাংশেরই কিশোর গ্যাং ও মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। হামলার সময় তারা মাদকাসক্ত ছিল। র্যাব-১০ এর হাতে গ্রেপ্তারকৃত চারজনের মধ্যে আলাউদ্দিন সরাসরি আলতাফ হোসেনের ওপর হামলা করে। জিহাদ চাকু দিয়ে তাকে আঘাত করে এবং গুরুতর জখম করে। আরেক আসামি আপন ওই এলাকার কিশোর গ্যাংয়ের মূল হোতা। তার বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে তিনটি মাদক মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। সে এসএস পাইপ দিয়ে আলতাফ হোসেনের মাথায় গুরুতর আঘাত করে। অপর আসামি ইমরানও হামলায় অংশ নেয়। যখন ওই সন্ত্রাসী দলটি গণপিটুনি দিচ্ছিল, তখন ইমরানও তাদের সঙ্গে ছিল। ওই দলের সদস্যসংখ্যা আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ জন ছিল।
ঘটনার বিস্তারিত বিষয় তুলে ধরে তিনি বলেন, এটি কোনো পূর্বপরিকল্পিত বিরোধকে কেন্দ্র করে ঘটেছে- এমনটা মনে হচ্ছে না। ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে শুরু হয়। সেখানে একটি অটো রিকশা গ্যারেজের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। পাঁচজন হামলাকারীরা একটি প্রাইভেটকারে ছিল। অটো রিকশাটি সেখানে কেন দাঁড়িয়ে রয়েছে, তা নিয়েই প্রথমে তাদের সঙ্গে গ্যারেজের মালিকের বিরোধের সূত্রপাত হয়। ওই পাঁচজন তখন মাদকাসক্ত ছিল। তারা গাড়ি থেকে নেমে প্রথমে গ্যারেজের বৃদ্ধ মালিক আবুল কালাম আজাদকে থাপ্পড় ও মারধর করে। তখন একজন মানবিক মানুষ হিসেবে আলতাফ হোসেন এগিয়ে গিয়ে বিষয়টি প্রতিহত ও সমঝোতার চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা তার কথায় কর্ণপাত করেনি। বাগ্বিতণ্ডা একপর্যায়ে হামলাকারীরা তার ওপরও আক্রমণ শুরু করে।
পরিস্থিতি বড় ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে রূপ নিয়েছে বুঝতে পেরে আলতাফ হোসেন নিজেকে বাঁচানোর জন্য দৌড় দেন। এরপর তিনি তার ছেলের ছোট একটি পোশাক কারখানায় ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। এরই মধ্যে ওই পাঁচজন এলাকার কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ফোন করে সেখানে ডেকে নেয়। পরবর্তী সময়ে তাদের সঙ্গে আরও লোকজন যুক্ত হলে সেখানে আনুমানিক ২৫ জনের মতো লোক জড়ো হয়। তারা কারখানার দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। এরপর প্রথমে আলতাফ হোসেনের ওপর হামলা চালানো হয়। তার চিৎকার শুনে তার ছোট ছেলে আরিফুল পেছন দিক থেকে এসে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। তখন তাকেও ফেলে দেওয়া হয় এবং মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয়। হামলায় এসএস পাইপসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র, চাকু এবং অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এসব অস্ত্র দিয়েই আলতাফ হোসেনকে হত্যা এবং তার ছেলেকে গুরুতর জখম করা হয়।