সোমবার, ১ জুন ২০২৬, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩


সূর্যের আগুন আর সবুজের আর্তনাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:১ জুন ২০২৬, ১৬:০১

ছবি ‍: সংগৃহীত

ছবি ‍: সংগৃহীত

গ্রীষ্মের দুপুর। তীব্র তাপ চারপাশে। আকাশে নেই মেঘ, স্থবির সবকিছু। গুমোট পরিবেশ। লু হাওয়া বইছে যেন। মাঠের ধান, বাগানের আম, রাস্তার পাশের কৃষ্ণচূড়া, সব যেন একসাথে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। সূর্য যেন আজ বলছে, ‘আমি আজ উত্তপ্ত খুব, দেখি কার থাকে সবুজ রূপ!’

মাঠের ধানগাছ মাথা নত করে উত্তর দিলো, ‘হে সূর্যদেব, এত তাপ দিও না আর, শুকিয়ে যাচ্ছে আমার জীবন, ফেটে যাচ্ছে ধার।’ পাশের আমগাছ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘আমার ছোট ছোট আমগুলো ঝরে পড়ছে ডালে, গরম হাওয়ার দাপটে বাঁচবো কীভাবে কালে?’

এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা শিমুলগাছ বলল, ‘আমি বনজ বৃক্ষ, ছায়া দিই প্রাণে, কিন্তু অতিরিক্ত গরম আমাকেও টানে ক্ষয়ের টানে।’

এমন সময় মাঠে এলেন কৃষক রহিম চাচা। মুখে চিন্তার রেখা, চোখে উদ্বেগ। তিনি বললেন, ‘বছর বছর গরম বাড়ছে, ঋতুর আচরণ বদলাচ্ছে। কখন খরা, কখন ঝড়, কৃষকের জীবন করছে জড়।’

তীব্র গরমে কৃষিজ ফসলের ঝুঁকি, ধানগাছ তখন বলতে শুরু করল, ‘অতিরিক্ত তাপে শুকিয়ে যায় মাটি, পানি না পেয়ে কমে যায় গতি। ফুল ঝরে যায়, দানা হয় না পূর্ণ, ফলন কমে হয় কৃষকের ক্ষতি চূড়ান্ত।’

ভুট্টা বলল, ‘গরমে পরাগায়ন ব্যাহত হয়, দানার সংখ্যা কমে যায় নিশ্চয়।’ সবজি ক্ষেতের বেগুন, মরিচ, টমেটো বলল, ‘ফুল ঝরে যায়, ফল ধরে কম, গরমে আমাদের জীবন হয় ভীষণ দমবন্ধ।’

সংলাপ কাল্পনিক হলেও তীব্র গরমে ফুল, ফসলসহ গোটা কৃষিখাতে ঝুঁকি এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অঢেল।

প্রধান ঝুঁকিসমূহ:

মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমে যায়। ফসলে তাপজনিত চাপ সৃষ্টি হয়। ফুল ও ফল ঝরে পড়ে। পরাগায়ন ব্যাহত হয়। রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বৃদ্ধি পায়। উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, ফলন কমে।

ফলজ বৃক্ষের আর্তনাদ:

বাগানের আম, লিচু, কাঁঠাল, পেয়ারা একসাথে বলল, ‘গরম বাতাসে ফল ঝরে যায়, পাতা শুকিয়ে হলুদ হয়। পানি কম পেলে ফলের আকার ছোট, কৃষকের স্বপ্ন তখন হয় ক্ষতবিক্ষত।’

লিচুগাছ বলল, ‘আমার ফলের খোসা ফেটে যায়, বাজারে দামও কমে যায়।’

আমগাছ বলল, ‘অতিরিক্ত তাপে ফলের গুণগত মান কমে, কৃষকের মুখে তখন দুশ্চিন্তা জমে।’

ফলজ গাছের ঝুঁকি:

ফল ঝরে পড়া বেড়ে যায়। পাতায় ঝলসানো দাগ থাকে। ফলের আকার ছোট হয়। ফল ফেটে যাওয়া বাড়ে। রোগবালাই বাড়ে। নতুন ডাল ও কুঁড়ির বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হয়।

বনজ বৃক্ষের নীরব কষ্ট:

পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা রেইন ট্রি বলল, ‘মানুষ ভাবে আমি শক্তিশালী, তবুও গরমে আমিও হই দুর্বল ভীষণ খালি।’

শালগাছ বলল, ‘দীর্ঘ খরায় শিকড় পায় না জল, বৃদ্ধি থেমে যায়, কমে জীবনীশক্তির বল।’

বনভূমির পাখিরা বলল, ‘গাছ শুকালে কোথায় হবে বাসা? প্রকৃতি তখন হারায় নিজের ভাষা।’

বনজ বৃক্ষের ঝুঁকি:

চারার মৃত্যুহার বৃদ্ধি পায়। বন আগুনের ঝুঁকি বাড়ে। গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি বাড়ে। পাখি ও উপকারী প্রাণীর আবাস ধ্বংস হয়।

তীব্র গরমে কৃষিজ ফসলের ঝুঁকি:

ধানগাছ যেন কৃষকের কাছে তার মনের কথা বলতে শুরু করল, ‘অতিরিক্ত তাপে শুকিয়ে যায় মাটি, পানি না পেয়ে থেমে যায় জীবনের গতি। ফুল ঝরে পড়ে, দানা হয় না পূর্ণ, ফলন কমে কৃষকের ক্ষতি হয় চরম।’

বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তীব্র তাপপ্রবাহ কৃষিক্ষেত্রে এক নতুন সংকট সৃষ্টি করেছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রায় মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমে যায়, ফলে ফসলের শিকড় পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে না।

ধানসহ বিভিন্ন কৃষিজ ফসলে ফুল ফোটা ও পরাগায়নের সময় তাপমাত্রা বেশি হলে ফুল ঝরে যায় এবং দানার পূর্ণতা ব্যাহত হয়। এতে ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। শুধু ধান নয়, সবজি, ফল ও অন্যান্য শস্যও তীব্র গরমের কারণে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়ে। পাতায় পোড়া দাগ, বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, রোগবালাইয়ের প্রকোপ বৃদ্ধি এবং পানির চাহিদা বেড়ে যাওয়া এখন সাধারণ সমস্যা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষকের উৎপাদন খরচ ও আয়ের ওপর।

তাই সময়োপযোগী সেচ ব্যবস্থা, মালচিং, তাপ-সহনশীল জাতের ব্যবহার এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাসভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনা এখন অত্যন্ত জরুরি। প্রকৃতির এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় টেকসই ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষিই হতে পারে কৃষকের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার অন্যতম পথ।

মাটির কান্না:

মাটি তখন কথা বলল, ‘গাছের ছায়া কমে গেলে আমি শুকায়, জৈব পদার্থ হারিয়ে দুর্বল হয়ে যাই। আমার বুকে ফাটল ধরে, উর্বরতা কমে ধীরে ধীরে।’

মাটির এই কথা শুনে কেঁচো বলল, ‘আর্দ্রতা না থাকলে আমিও বাঁচি না, মাটি উর্বর করার কাজ তখন আর হয় না।’

করণীয় কী?

কৃষক রহিম চাচা তখন সবাইকে বললেন, ‘সমস্যা আছে, সমাধানও আছে, বিজ্ঞান আর সচেতনতা পথ দেখায় কাছে।’

মালচিং ব্যবহার: খড়, পাতা, জৈব আবরণ মাটির উপরে বিছিয়ে দিলে, পানি কম শুকায়। মাটির তাপমাত্রা কমে। আগাছা কম জন্মায়।

সঠিক সেচ ব্যবস্থাপনা: ফোঁটা ফোঁটা জল বাঁচায় ফসলের প্রাণ। ড্রিপ সেচ ব্যবহার। সকালে বা বিকেলে সেচ প্রদান। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ।

জৈব পদার্থ বৃদ্ধি: কম্পোস্ট ব্যবহার, ভার্মি কম্পোস্ট প্রয়োগ, সবুজ সার ব্যবহার, এগুলো মাটির পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায়।

ছায়া ও বায়ুরোধক ব্যবস্থা: ফলজ চারার পাশে, শেডনেট ব্যবহার। দ্রুত বর্ধনশীল গাছ রোপণ। বায়ুরোধক সবুজ বেষ্টনী তৈরি।

জলবায়ু সহনশীল জাত নির্বাচন: খরা সহনশীল ফসল। তাপ সহনশীল জাত। স্থানীয় অভিযোজিত জাতের ব্যবহার।

প্রযুক্তির ব্যবহার: আজকের কৃষিতে প্রযুক্তি বড় সহায়ক। আবহাওয়া পূর্বাভাস। স্মার্ট সেচ ব্যবস্থা। IoT ভিত্তিক মাটি বিশ্লেষণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক কৃষি পরামর্শ। ড্রোন প্রযুক্তি। এসব প্রযুক্তি কৃষককে আগাম সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

বেশি বেশি বৃক্ষরোপণ: একটি গাছ শুধু ফল বা কাঠ দেয় না। গাছ, তাপমাত্রা কমায়। কার্বন শোষণ করে। মাটি রক্ষা করে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে।

সবুজের অঙ্গীকার: সন্ধ্যা নেমেছে। দিনভর তাপের পরে মাঠে একটু বাতাস বইছে। ধানগাছ, আমগাছ, শিমুলগাছ, কেঁচো, পাখি সবাই যেন নতুন আশায় বুক বাঁধছে।

কৃষক রহিম চাচা আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘জলবায়ু বদলাবে, চ্যালেঞ্জ আসবে বারবার, তবু থামবে না কৃষকের সংগ্রাম আর। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, বৃক্ষ আর সচেতনতার হাত ধরে, সবুজ বাংলাদেশ গড়বো আমরা একসাথে মিলে।’

শেষে যেন প্রকৃতি নিজেই একটি ছন্দ শোনায়, ‘গাছ বাঁচাও, মাটি বাঁচাও, বাঁচাও জীবনের গান, পানি সঞ্চয়, সবুজ চর্চা, এটাই হোক সবার জ্ঞান। তীব্র গরমে হার মেনো না, রাখো প্রকৃতির মান, সবুজ পৃথিবী গড়তে আজই বাড়াও বৃক্ষের প্রাণ।’

তীব্র গরম শুধু কৃষকের নয়, প্রকৃতিরও বড় চ্যালেঞ্জ। তাই ফলজ, বনজ ও কৃষিজ ফসল রক্ষায় পানি সংরক্ষণ, জৈব কৃষি, স্মার্ট প্রযুক্তি এবং ব্যাপক বৃক্ষরোপণই হতে পারে টেকসই ভবিষ্যতের সবচেয়ে কার্যকর পথ।

সমীরণ বিশ্বাস : কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

নামাজের সময়সূচি

ওয়াক্ত সময়সূচি
ফজর ৩:৪৫ - ৫:০৬ ভোর
যোহর ১১:৫৬ - ৪:২৬ দুপুর
আছর ৪:৩৬ - ৬:৩৬ বিকেল
মাগরিব ৬:৪১ - ৮:০৩ সন্ধ্যা
এশা ৮:০৮ - ৩:৪০ রাত

সোমবার ১ জুন ২০২৬